প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার পরও ইয়েমেনের হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে পারছে না দেশটি।
গত শনিবার সৌদির রাজধানী রিয়াদের প্রধান বিমানবন্দরেও প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে সৌদি আরবের ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের একটি সৌদি আরব। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য থেকেও উন্নত অস্ত্র কিনেছে।
তবে এত অস্ত্র থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের জন্য পুরো দেশকে হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। দেশটিকে একইসঙ্গে পূর্ব, উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের হুমকি মোকাবিলা করতে হচ্ছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে পূর্ব দিক থেকে সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে ইরান। উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম অয়েল পাইপলাইনে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। আর দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকা থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা।
সৌদি আরবের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকানোর পাশাপাশি দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেলক্ষেত্র, বিমানবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষা করা বড় চ্যালেঞ্জ। হামলার আশঙ্কা দেখা দিলে দ্রুত তা শনাক্ত করতে হয়। এরপর কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ভূপাতিত করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হয় এবং সাধারণ মানুষকেও সতর্ক করতে হয়। এসব কাজের জন্য সময় পাওয়া যায় খুবই কম।
সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সৌদি আরব অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারলেও কিছু হামলা ঠেকাতে পারছে না।
দেশটির এক সূত্রের ভাষ্য, এত বেশি স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কোথায় মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কর্তৃপক্ষকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
হুতিরা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দূরপাল্লার ড্রোন ব্যবহার করে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই কৌশলের সঙ্গে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার মিল রয়েছে। রাশিয়াও একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ড্রোন ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালিয়েছে।
আর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ায় সেগুলো শনাক্ত ও অনুসরণ করা কঠিন। অন্যদিকে হুতিরা এমন নতুন প্রজন্মের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যেগুলো গতিপথও পরিবর্তন করতে পারে বলে তাদের দাবি। ফলে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা থাকলেও সব হামলা ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না।
হুতিদের এই সামরিক সক্ষমতা বাড়ার পেছনে বাইরের সহায়তার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞদের তথ্য তুলে ধরে সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও আট বছর আগে ইয়েমেনে ইরানের তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ, সামরিক সরঞ্জাম ও ড্রোন শনাক্ত করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘের ওই প্যানেল দুই বছর আগে জানায়, বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে হুতিদের কাছে সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি হস্তান্তর, অর্থায়ন এবং যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের মাত্রা নজিরবিহীন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হুতিদের হাতেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানের অস্ত্রের মিল রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতির এবং নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। গত বছর হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এড়িয়ে বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হানে।
ওই সময় নিরাপত্তা বিশ্লেষক আমির বার শালোম সিএনএনকে বলেন, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের এত নির্ভুল হওয়া উল্লেখযোগ্য।
এ ছাড়া ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির ভাষ্য, হুতিরা ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষার অস্ত্রেও পরিবর্তন এনেছে। এসব অস্ত্র দিয়ে বিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে আঘাত হানার চেষ্টা করছে তারা।
গত মাসে তিনি বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ২৫ মিনিট পর্যন্ত যেকোনো সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে এবং তাপ শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু অনুসরণ করে।
হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত জোটের অংশ। হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরাকের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও হুতিরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে বলে জানিয়েছে সিএনএন।
তেহরানের সঙ্গে হুতিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যে প্রতিনিধিদলও পাঠিয়েছিল তারা। তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাতে ইয়েমেনের হুতিনিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। এরপরও অর্থনৈতিক ও পরিবহন অবরোধ অব্যাহত রয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত জুলাইয়ে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার ঘোষণা দেয় হুতিরা। এরপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। প্রথম দিকে লোহিত সাগরের উপকূলে সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগার ও সৌদি বিমানঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
মধ্যস্ততা করতে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তা বন্ধ করা এবং দেশটির কাছ থেকে কয়েকশ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণও দাবি করছে হুতিরা।
এ অবস্থায় সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে আলোচনা শুরুর প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। সোমবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, দুই পক্ষের আলোচনা শুরু করতে প্রয়োজনীয় যেকোনো সহায়তা দিতে প্রস্তুত তেহরান।
হুতিদের রাজনৈতিক শাখার সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি দাবি করেন, সৌদি আরব মধ্যস্থতার প্রস্তাবে রাজি হয়েছে। তবে দুই সপ্তাহ ও এক মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে হুতিরা।
আল-বুখাইতি বলেন, এবারের লড়াই আগের মতো নয়। প্রতিদিন সংঘাতের পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে। আজ যে সমঝোতা সম্ভব, আগামীকাল তা কঠিন, এমনকি অসম্ভবও হয়ে উঠতে পারে।
হুতিদের সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যেও সৌদি আরব পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করেছে। গত সপ্তাহে দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আগাম সতর্কবার্তা মোবাইল ফোনে পাঠানো বন্ধ করে দেয়। এর পরপরই রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা হয়।
রিয়াদের কয়েকজন বাসিন্দা সিএনএনকে বলেছেন, পরে আবার সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়েছে।
তবে সতর্কবার্তা বন্ধ থাকার বিষয়ে সিএনএনের প্রশ্নের জবাব দেয়নি সৌদি সরকার।
সৌদি সরকারের দাবি, সোমবার তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
রিয়াদে বসবাসরত এক প্রবাসী জানান, এ সপ্তাহে তার সন্তানদের বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। আগের কয়েক দিন হামলার আগাম সতর্কবার্তা না আসায় তিনি ক্ষুব্ধ ছিলেন। একইসঙ্গে বিমানবন্দরে হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিয়েও হতাশা প্রকাশ করেন তিনি।