মাইক্রোসফট এবং আরও কয়েকটি প্রযুক্তি কোম্পানিকে একটি বহুল ব্যবহৃত ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ বিদেশি কর্মীদের স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত করেছে হোয়াইট হাউস।
মাইক্রোসফটসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে, এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচি এবং বিদেশ থেকে আসা কর্মীদের স্থায়ী মার্কিন বাসিন্দা হওয়ার সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স।
সংবাদ সম্মেলনে ভ্যান্স দাবি করেন যে, আমেরিকার সবচেয়ে মূল্যবান কোম্পানিগুলোর একটি মাইক্রোসফট কার্যত আমেরিকান কর্মীদের বদলে “বিদেশি চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক” নিয়োগ করছে।
মাইক্রোসফট জানিয়েছে, গত অর্থবছরে দাখিল করা বেশিরভাগ এইচ-১বি ভিসা ছিল বিদ্যমান কর্মীদের জন্য, যাদেরকে স্থানীয় কর্মীদের সমান বেতন দেওয়া হয়।
ভ্যান্স বলেন, “আমেরিকার অন্য কোনো কোম্পানি মাইক্রোসফটের চেয়ে বেশি এই ব্যবস্থার অপব্যবহার করেনি।”
তিনি অ্যাডোবি, কগনিজেন্ট, ইনফোসিস, টাটা, উইপ্রো, এইচসিএল এবং ক্যাপজেমিনির বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ করেন।
একই সংবাদ সম্মেলনে শ্রমমন্ত্রী কিথ সন্ডারলিং বলেন, মার্কিন সরকার মাইক্রোসফট বা অন্য সাতটি কোম্পানির কোনো নতুন বা বিচারাধীন পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন প্রোগ্রাম বা পার্ম আবেদন অনুমোদন করবে না।
সন্ডারলিং এও বলেন যে, মাইক্রোসফটের মতো কোম্পানি এবং মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো “ভিসা তৈরির কারখানায়” পরিণত হয়েছে, যারা আমেরিকাকে বিদেশি কর্মী দিয়ে “ভাসিয়ে” দিচ্ছে।
এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সবগুলো কোম্পানির সাথেই যোগাযোগ করেছে বিবিসি। পার্ম প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পূর্বশর্ত হিসেবে, এইচ-১বি ভিসার মোট সংখ্যা বছরে সর্বোচ্চ ৮৫ হাজারে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে।
মাইক্রোসফটের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে জানান, “যুক্তরাষ্ট্রে মাইক্রোসফটের অধিকাংশ কর্মীই আমেরিকান”।
কোম্পানিটিতে বিশ্বব্যাপী দুই লাখেরও বেশি কর্মী কর্মরত আছেন।
ভ্যান্স বলেন যে, মাইক্রোসফট একই সময়ে প্রায় ছয় হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে এবং ছয় হাজার ৮০০টি এইচ-১বি ভিসার আবেদন করেছে।
তিনি দাবি করেন, এটিই প্রমাণ করে যে কোম্পানিটি দেশীয় কর্মীদের বদলে বিদেশি কর্মী ব্যবহার করছে এবং তাদের মজুরি কমিয়ে দিচ্ছে।
মাইক্রোসফটের মুখপাত্র বলেন, গত অর্থবছরে কোম্পানি যে এইচ-১বি ভিসার আবেদন জমা দিয়েছে তার ৮০ শতাংশ ইতোমধ্যে মাইক্রোসফটে কর্মরত কর্মচারীদের সাথে সম্পর্কিত, নতুন নিয়োগের জন্য নয়। মাইক্রোসফট এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে যে আন্তর্জাতিক কর্মীদের নিয়োগ করে তাদের সেই একই স্তরের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় যা একজন আমেরিকান কর্মী পাবেন।
বিদেশ থেকে দক্ষ কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় অনেক প্রযুক্তি কোম্পানিকে সহায়তা করে এমন একটি কোম্পানি এলিসের মতে, মাইক্রোসফটে একজন এইচ-১বি কর্মীর গড় বেতন এক লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার।
“আমরা প্রশাসনকে অতিরিক্ত তথ্য সরবরাহ করার জন্যও উন্মুখ হয়ে আছি,” মাইক্রোসফটের মুখপাত্র বলেন।
মাইক্রোসফটের দীর্ঘদিনের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছ থেকে প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য একটি অভিনব পদক গ্রহণ করেছেন।
অনুষ্ঠানে নাদেলাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেন, হোয়াইট হাউস তাকে পদক দিতে পেরে “সম্মানিত” এবং এটি “তার যোগ্যতারই প্রতিফলন”।
ট্রাম্পের কাছ থেকে পদক পাওয়া অন্যান্য প্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা হলেন ইলন মাস্ক, জেনসেন হুয়াং, লিসা সু, সের্গেই ব্রিন এবং মাইকেল ডেল।
নাদেলা এবং পদকপ্রাপ্তদের বেশিরভাগই সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের অন্যান্য অনুষ্ঠানেও উপস্থিত ছিলেন। যার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক একটি মধ্যাহ্নভোজ এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সম্মানে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় নৈশভোজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এরপরও, বৃহস্পতিবার ভ্যান্সের সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মাইক্রোসফট।
ভ্যান্স বলেন, “মাইক্রোসফটের প্রতি আমাদের বার্তা খুবই সহজ: আপনারা একটি মহান আমেরিকান কোম্পানি, আপনাদেরকে অবশ্যই আমেরিকান কর্মী নিয়োগ করতে হবে। আপনারা আমেরিকান কর্মীদের ছাঁটাই করে তাদেরকে বিদেশি চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে পারেন না।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, বিদেশ থেকে আসা কর্মীদের সম্পর্কে তার এভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো, যে কোম্পানি বা সংস্থা তাদের ভিসা স্পনসর করেছে, সেই কোম্পানি থেকে তাদের চাকরিচ্যুত বা ছাঁটাই করা হলে তাদের আমেরিকা “ছেড়ে যেতে হয়”।
সাধারণত, এমন পরিস্থিতিতে একজন কর্মী ৬০ দিনের গ্রেস পিরিয়ড পান। গত মাসে, মার্কিন সরকার সেই গ্রেস পিরিয়ডও সম্পূর্ণভাবে বাতিল করার প্রস্তাব করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার ওপর ইংরেজিতে ভিসা লেখা একটি ইলাস্ট্রেশন, প্রতীকী ছবিছবির উৎস,Getty Images আমেরিকার প্রতিটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এইচ-১বি ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কর্মী নিয়োগ করে এবং বহু বছর ধরে তা এটি করে আসছে।
যার মধ্যে অ্যামাজন, গুগল, মেটা, অ্যাপল, এনভিডিয়াসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু ভ্যান্সের বৃহস্পতিবারের মন্তব্যে- সেই কোম্পানিগুলোর অন্য কোনোটিই অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
কয়েক দশক ধরে এই কর্মসূচিটি এমন উচ্চ দক্ষ বা বিশেষায়িত কর্মীদের লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে, যাদের কোনো কোম্পানির প্রয়োজন, কিন্তু তারা দেশের অভ্যন্তরে তাদের খুঁজে পেতে বা নিয়োগ করতে পারে না।
পার্ম কর্মসূচি হলো এমন কর্মীদের স্থায়ী মার্কিন বাসিন্দা হওয়ার একটি পথ, যা প্রায়শই গ্রিন কার্ডের দিকে নিয়ে যায়। যা তাদের অনির্দিষ্টকালের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকতে এবং কাজ করার অনুমতি দেয়।
গত অর্থবছরে, মার্কিন শ্রম দপ্তর দশটি ব্যবসায়িক বিভাগে এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি পার্ম আবেদন অনুমোদন করেছে।