দাতা দেশগুলো বিশ্বব্যাপী উন্নয়ন সহায়তা কমিয়ে দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রায় ২,২০০টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) অর্থায়ন গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ঢাকার আগারগাঁওয়ে বিআইডিএস আয়োজিত 'বিয়ন্ড ফরেন ডিপেন্ডেন্স: দ্য ফিউচার অব এনজিও ফাইন্যান্সিং ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক সেমিনারে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) এক গবেষণায় এই চিত্র তুলে ধরা হয়। সেমিনারে মূল গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের গবেষণা পরিচালক ড. কাজী ইকবাল।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ধনী দেশগুলোর দেয়া উন্নয়ন সহায়তা প্রকৃত অর্থে ২৩ শতাংশ কমেছে, একক কোনো বছরে এটি সর্বোচ্চ বার্ষিক পতনের রেকর্ড। ইতোমধ্যে মার্কিন সংস্থা ইউএসএআইডি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, জার্মানি ও ফ্রান্স তাদের সহায়তা বাজেট কমিয়েছে।
পূর্বে অনুমোদিত প্রকল্পের অর্থ ছাড় অব্যাহত থাকায় বাংলাদেশ এখনো এর পূর্ণ প্রভাব টের পায়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর মাধ্যমে ছাড় করা বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। তবে নতুন প্রকল্পের অনুমোদন ব্যাপকভাবে কমেছে; ২০২১-২২ অর্থবছরে নতুন অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা ২,০৬৩টি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১,৫৮৪টিতে নেমে এসেছে।
বিশেষ করে যেসব ক্ষুদ্র ও মাঝারি এনজিওর কোনো ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম নেই এবং তারা প্রায় পুরোটাই বৈশ্বিক অনুদানের ওপর নির্ভরশীল—এমন আনুমানিক ২,২০০টি এনজিও সবচেয়ে বেশি নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়েছে।
এনজিও বিষয়ক ব্যুরো ও মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির তথ্য বিশ্লেষণ, ৪৬টি এনজিওর ওপর জরিপ, পরামর্শসভা, দলীয় আলোচনা, বিশেষজ্ঞদের সাক্ষাৎকার এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার ভিত্তিতে এই গবেষণা তৈরি করা হয়।
জরিপের ফল অনুযায়ী, কেবল বৈদেশিক অনুদানের ওপর চলা প্রতি তিনটি এনজিওর মধ্যে দুটিই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে এবং তাদের বাজেট গড়ে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তবে যেসব এনজিওর ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই বাজেট হ্রাসের হার ১২ শতাংশ।
কাজী ইকবালের প্রবন্ধে বলা হয়, এনজিও ব্যুরোর মাধ্যমে প্রাপ্ত বৈদেশিক অনুদান ২০১৮-১৯ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ৯৫৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। পরে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা ৩১ শতাংশ কমে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলারে নামলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবার ৮৩৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিলও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে; ২০২২ সালের ১,১২৯ কোটি টাকা থেকে কমে ২০২৫ সালে তা ৩৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
নতুন অর্থায়ন মডেল প্রয়োজন বিদ্যমান সংকট উত্তরণে গবেষণায় সরকারি ক্রয়, সিএসআর এবং অন্যান্য অর্থায়নের সুযোগ পেতে যোগ্য এনজিওগুলোর একটি উন্মুক্ত তালিকা তৈরির সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি এনজিও ফাউন্ডেশন ও পিকেএসএফের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এনজিওগুলোকে অর্থায়ন করা, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসে এনজিও সংক্রান্ত বিধান শক্তিশালী করা এবং সামাজিক ব্যবসার আইনি স্বীকৃতি ও কর সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়।
সেমিনারে ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, 'এনজিওগুলোর মূল শক্তি হলো সরাসরি প্রান্তিক মানুষের সাথে কাজ করা এবং মেয়েদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য ও জলবায়ু অভিযোজনের মতো ক্ষেত্রে ইতিবাচক আচরণগত পরিবর্তন আনা।'
তিনি একটি স্বচ্ছ সরকারি-এনজিও অংশীদারিত্ব কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, 'যেখানে সরকার সরাসরি মানুষের ঘরে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে এনজিওগুলো তুলনামূলকভাবে কম খরচে সেবা পৌঁছে দিতে পারে।'
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সেবা প্রদানের জন্য এনজিও এবং বেসরকারি খাতকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক অংশীদারিত্বের মডেল তৈরির পরিকল্পনা করছে সরকার।
তিনি বলেন, 'আমরা নীতি ছাড়াই কাজ করছি। এখন আমাদের এটি কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায় তা নিয়ে কাজ করতে হবে।'
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, 'এলডিসি উত্তরণের প্রেক্ষাপটে এনজিওগুলোর বৈদেশিক অর্থায়ন প্রায় শেষের দিকে।' তাই গ্রিন ও কার্বন ফাইন্যান্সের মতো বিকল্প উৎসগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে উল্লেখ করে তিনি জানান, এনজিওগুলোকে দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একীভূত করে সরকারের সহায়ক শক্তিতে পরিণত করার পরিকল্পনা চলছে।
তিনি আরও জানান, সরকার-এনজিও সম্পর্ক বিষয়ক নির্দেশিকা চূড়ান্ত করা হচ্ছে এবং এনজিওগুলোর প্রস্তাব বিবেচনা করা হবে। একইসঙ্গে গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং অর্জিত লক্ষ্যমাত্রার ওপর ভিত্তি করে অর্থ ছাড় নিশ্চিত করতে প্রকল্প অর্থায়নকে পরিমাপযোগ্য সামাজিক ফলাফলের সাথে যুক্ত করার পরামর্শ দেন তিনি।
বিআইডিএসের মহাপরিচালক অধ্যাপক এ কে এনামুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.