ইরানের পারস্য উপসাগর তীরের বন্দরগুলোর ওপর অব্যাহত রয়েছে মার্কিন নৌ অবরোধ। এই অবস্থায়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে বিকল্প পথের দিকে ঝুঁকছে তেহরান। দক্ষিণের বন্দরগুলো অচল হয়ে পড়ায়, জ্বালানি তেল রপ্তানি এবং জরুরি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির জন্য ইরানের উত্তর উপকূলের কাস্পিয়ান সাগরের নৌপথ—এখন বহির্বিশ্বের সাথে সংযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এক অচলাবস্থায় রয়েছে, যেখানে সংঘাত নিরসনের কোনো আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে না। এই অচলাবস্থা কাটাতে এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে ইরানের প্রস্তাব—তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবকেও 'অগ্রহণযোগ্য' বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনেও এই সংঘাত নিরসনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে—এই যুদ্ধের সূচনা হয়। কিন্তু, সেটি অবসানের কোনো লক্ষণ না থাকায়, তেহরান এখন জ্বালানি তেল রপ্তানি ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে কৌশলগত পরিবর্তন আনছে। যদিও কাস্পিয়ান সাগর দিয়ে সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিচালনার নিজস্ব কিছু লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কাস্পিয়ান সাগরে বাণিজ্যের চ্যালেঞ্জ
বিশ্বের বৃহত্তম আবদ্ধ জলাশয় (ল্যান্ডলকড ওয়াটার বডি) কাস্পিয়ান সাগরের সীমানা ভাগাভাগি করছে ইরান, রাশিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্থান ও তুর্কমেনিস্তান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায়– এই সাগরে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
গত এপ্রিলে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) নির্বাহী পরিচালক ইনগার অ্যান্ডারসেন জানান, ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে কাস্পিয়ান সাগরের পানির স্তর প্রায় ২ মিটার (৬.৬ ফুট) নেমে গেছে। চলতি শতাব্দীর শেষ নাগাদ সাগরের পানির স্তর আরও ৮ থেকে ২১ মিটার (২৬ থেকে ৬৯ ফুট) হ্রাস পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরানের পরিবেশ বিষয়ক দপ্তরের উপকূলীয় ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষা কার্যালয়ের মহাপরিচালক শাহরাম ফাদাকার গত সপ্তাহে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, গত দুই থেকে তিন বছরে (কাস্পিয়ানে) পানির স্তর বার্ষিক ২০ সেন্টিমিটারেরও (৭.৯ ইঞ্চি) বেশি করে কমছে। এটি ইরানসহ কাস্পিয়ান সাগর তীরের সবকটি দেশের বাণিজ্যিক সংযোগের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
চলতি মাসে শিপিং অ্যাসোসিয়েশন অব ইরানের মহাসচিব মাসুদ পোলমে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে জানান, ইরানের উত্তরের (কাস্পিয়ান তীরের) বন্দরগুলো একসময় ৬,০০০ টন ওজনের জাহাজ নোঙর করার সক্ষমতা রাখত। কিন্তু, পানির স্তর কমে যাওয়ার কারণে, সেখানে বর্তমানে সর্বোচ্চ ৪,০০০ টনের জাহাজ নোঙর করতে পারছে।
কাস্পিয়ান সাগর হয়ে রাশিয়ার ভলগা নদীতে প্রবেশ করা ইরানি জাহাজগুলো কম পানির কারণে চরায় আটকে পড়ছে। এমনকি ক্রু সদস্যদের উদ্ধার করার আগপর্যন্ত, এসব জাহাজকে টানা কয়েক দিন ও সপ্তাহ ধরে এক জায়গায় স্থবির হয়ে থাকতে হচ্ছে।
তবে পোলমে আশ্বস্ত করে বলেন, "সৌভাগ্যবশত আমাদের বন্দরগুলোতে এখনও এরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।"
ইরানের সামুদ্রিক বাণিজ্যের সিংহভাগই মূলত দক্ষিণের পারস্য উপসাগরের বন্দরগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর পর, সেগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ এবং বন্দরের অবকাঠামোতে—বিমান হামলার কারণে তেহরান এখন কাস্পিয়ান সাগর ও স্থল সীমান্তপথের দিকে বাণিজ্যের প্রবাহ ঘুরিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বর্তমানে উত্তরে (কাস্পিয়ান রুটে) ইরানের বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর সরাসরি কোনো সামরিক হামলা হচ্ছে না। তবে রাশিয়া, মধ্য এশিয়া ও ককেশাস বিষয়ক ইরানি গবেষক ওয়ালি কালেজি জানান, লজিস্টিক কার্যক্রমের পরিবর্তনের ফলে ইরানের স্থল সীমান্তগুলোতে অভূতপূর্ব চাপ তৈরি হয়েছে।
আর্মেনিয়া সংলগ্ন নরদুজ সীমান্ত পয়েন্টে ইরানে প্রবেশের জন্য প্রায় ১,৮০০টি ট্রাককে টানা কয়েক দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অন্যান্য টার্মিনালে প্রবেশের জন্য অপেক্ষার সময় ১০ থেকে ১৫ দিনে গিয়ে ঠেকেছে। তবে কালেজি জানান, এই যানজট কেবল সড়কপথে পণ্য পরিবহনের কারণে হয়নি।
কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে তিনি বলেন, "টার্মিনালের সীমিত সক্ষমতা, কাস্টমস প্রক্রিয়া, ভঙ্গুর সড়ক অবকাঠামো এবং চলমান উন্নয়ন কাজগুলোও এই দীর্ঘ যানজটের জন্য দায়ী। পাশাপাশি ইরানি বিমানসংস্থাগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে আর্মেনিয়া ও তুরস্ক সীমান্ত দিয়ে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের চাপ বেড়েছে। এতে সীমান্ত টার্মিনালগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।"
পূর্ব কাস্পিয়ান রেলপথটি তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্থান এবং চীনের সঙ্গে সরাসরি ইরানি পণ্য পরিবহনের সংযোগ সুবিধা দেয়। কিন্তু দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের সঙ্গে ইরানের যে রেল সংযোগ ছিল, তা ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৪ সালের প্রথম নগরনো-কারাবাখ যুদ্ধের সময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আজও সেটি বন্ধই রয়েছে।
কালেজি জানান, সোভিয়েত যুগের দক্ষিণ ককেশাস রেলওয়ে নেটওয়ার্কের অংশ 'জুলফা-নাখচিভান' রেলপথটির পুনরুজ্জীবন মূলত আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানের মধ্যকার শান্তি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে, বিশেষত ওই অঞ্চলে মার্কিন সমর্থিত 'ট্রিপ' ট্রানজিট করিডোর বাস্তবায়নের ওপর।
"যেহেতু উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরে—পশ্চিমাঞ্চলীয় রুটের ট্রানজিট ও বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়েই পরিচালিত হয়, তাই দক্ষিণ ককেশাসের সাথে রেল সংযোগের অনুপস্থিতি ইরান থেকে পণ্য পরিবহন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা—বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলে নৌ অবরোধ জোরদার হওয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে," বলেন কালেজি।
আনজালি, আমিরাবাদ এবং নাওশাহর-সহ কাস্পিয়ান সাগরের বন্দরগুলোতে ঠিক কী পরিমাণ বা কোন ধরনের পণ্য উত্তরমুখী বাণিজ্যের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি ইরানি কর্তৃপক্ষ। তবে খাদ্যপণ্যের মতো জরুরি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আমদানিতে এই পথ ব্যবহারের স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
গত মাসে ইরানের বন্দর ও সামুদ্রিক সংস্থার (পিএমও) প্রধান মোহাম্মদ শাকিবি-নাসাব দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমকে জানান, ইরানের মোট প্রাক্কলিত বন্দর ধারণক্ষমতা ৩০ কোটি টন হলেও—উত্তরের বন্দরগুলোর সক্ষমতা মাত্র ৩ কোটি টন। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানিতে উত্তরের বন্দরগুলোর অবদান যেখানে ১৮ শতাংশ ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
তিনি জানান, দক্ষিণের এবং উত্তরের বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর পণ্য বহনের সর্বোচ্চ সক্ষমতার মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। দক্ষিণের মাত্র একটি বড় জাহাজ যে পরিমাণ পণ্য বহন করতে পারে, কাস্পিয়ান সাগরে চলাচলকারী ২০টি জাহাজ মিলে সেই পরিমাণ পণ্য পরিবহন করে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে উত্তরের গিলান প্রদেশের গভর্নর হাদি হাগশেনাস জানান, ২২ আগস্ট শেষ হওয়া ইরানি পঞ্জিকাবর্ষের গত পাঁচ মাসে, কাস্পিয়ান সাগরের বন্দরগুলোতে কনটেইনার পৌঁছানোর হার –- আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে।
তিনি আরও জানান, ইরানের প্রধান প্রধান শহর যেমন– তেহরান, ইসফাহান ও আরাকের অনেক কাছাকাছি অবস্থিত কাস্পিয়ান তীরের এসব বন্দর। দক্ষিণের বন্দরগুলো সে তুলনায় বেশি দূরে অবস্থিত। উত্তরের বন্দরগুলোর এই ভৌগোলিক নৈকট্য আমদানিকৃত পণ্য সড়কপথে পরিবহনের খরচ কমাতে সাহায্য করবে।
হাগশেনাস বলেন, চীন-আকটাউ-উত্তর ইরান রুটটি (যা চীন থেকে কাজাখস্থান হয়ে আকটাউ বন্দর পর্যন্ত রেলে এবং সেখান থেকে কাস্পিয়ান সাগরে জাহাজে ও শেষে সড়কপথে ইরানে পণ্য নিয়ে যায়) আঞ্চলিক বাণিজ্যকে বহুগুণ বিস্তৃত করতে পারে।
বর্তমানে ইরান সরকার রাশিয়ার সাথে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ 'রেশত-আস্তারা' রেলপথের অসম্পূর্ণ অংশ তৈরির কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে।
এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে আন্তর্জাতিক উত্তর-দক্ষিণ পরিবহন করিডোরের (আইএনএসটিসি) পশ্চিমাঞ্চলীয় রেল শাখাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। এই রেলপথ ইরান, আজারবাইজান ও রাশিয়ার মধ্য দিয়ে গেছে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.