1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০৫ পূর্বাহ্ন

নৌযানে মার্কিন হামলা ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হতে পারে: জাতিসংঘ

Reporter Name
  • Update Time : মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ২০ Time View

ক্যারিবীয় সাগর ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে যুক্তরাষ্ট্রের চালানো হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন।

সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে জাতিসংঘের সন্ত্রাসবাদ ও মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষ প্রতিবেদক বেন সল বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ৬৮টি নৌযানে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় অন্তত ২২৩ জন নিহত হয়েছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বেআইনি শক্তি প্রয়োগ করেছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের মতে, হামলাগুলো যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন- উভয়ের অধীনেই ন্যায্যতা পাওয়ার মতো নয়।

প্রতিবেদনে এসব হামলাকে ‘ধারাবাহিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এগুলো ‘সম্ভাব্যভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে’।

কেন হামলাগুলোকে অবৈধ বলছে জাতিসংঘ?
বেন সল বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যেসব নৌযানকে মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করছে, তাদের কেউ সংগঠিত অপরাধী বা ‘সন্ত্রাসী’ গোষ্ঠীর সদস্য হলেও সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামরিক হামলার বৈধ কারণ হয়ে যায় না।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব নৌযান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনও সশস্ত্র হামলা চালিয়েছে বা অন্য কোনও রাষ্ট্রের হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রক্সি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে- এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগের আইনি ভিত্তি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

বেন সলের ভাষায়, মাদক পাচারকে সামরিক হামলার সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

এছাড়া পর্যবেক্ষকেরাও উল্লেখ করেছেন, যেসব নৌযানে হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলোর কোনওটি সত্যিই মাদক পাচার করছিল- এমন প্রমাণ যুক্তরাষ্ট্র রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রকাশ করেনি।

৭০ হামলায় নিহত ২৩৪
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আগস্ট পর্যন্ত ৬৮টি হামলায় ২২৩ জন নিহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। এরপর চলতি সেপ্টেম্বরে আরও দুটি হামলা চালানো হয়েছে। এতে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ২৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে এবং মোট হামলার সংখ্যা হয়েছে ৭০টি।

২০২৫ সালের ২ সেপ্টেম্বরের প্রথম দফার হামলাগুলোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ডাবল ট্যাপ’ কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। অর্থাৎ, একটি নৌযানে প্রথম হামলার পর জীবিতদের লক্ষ্য করে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানোর অভিযোগ।

ওই হামলায় ১১ জন নিহত হন। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসেও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। আইনপ্রণেতারা পেন্টাগনের কাছে হামলার সম্পূর্ণ ভিডিও প্রকাশের দাবি জানান।

এছাড়া প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ‘সবাইকে হত্যা করার’ নির্দেশ দিয়েছিলেন- এমন অভিযোগও ওঠে। তবে পরে কংগ্রেসে সাক্ষ্য দেওয়া জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, হেগসেথ এমন নির্দেশ দেননি।

যুক্তরাষ্ট্রের মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রশাসন (ডিইএ)-এর আন্তর্জাতিক কার্যক্রমের সাবেক প্রধান মাইকেল ভিজিল কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে বলেন, “এটি হত্যা।” তার মতে, এ ধরনের ঘটনা নৈতিক বিবেককে নাড়া দেওয়ার মতো গুরুতর।

কেন নৌযানে হামলা চালাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
যুক্তরাষ্ট্র গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ভেনেজুয়েলা থেকে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ও ক্যারিবীয় সাগর হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক পাচার করা হচ্ছে- এমন অভিযোগে বিভিন্ন নৌযানে হামলা শুরু করে।

মার্কিন সামরিক বাহিনী নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব হামলার ভিডিও প্রকাশ করেছে। তবে হামলায় নিহত ব্যক্তিদের সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। একই সঙ্গে তাদের মাদক পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার দাবির পক্ষে বিস্তারিত প্রমাণও প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন।

অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রে পাচার হওয়া অধিকাংশ মাদক ভেনেজুয়েলা থেকে সমুদ্রপথে আসে না। বরং মেক্সিকো হয়ে স্থলপথে যুক্তরাষ্ট্রে মাদক প্রবেশের পরিমাণ বেশি।

নিহতদের পরিবারের অনেকেই দাবি করেছেন, তাদের স্বজনেরা মাদক পাচারকারী নন, বরং জেলে বা জেলে হিসেবে কাজ করা মানুষ ছিলেন।

সর্বশেষ হামলায় চারজন নিহত
সর্বশেষ শনিবারের হামলায় চারজন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।

ওয়াশিংটনের দাবি, নৌযানটি ‘মাদক পাচারের প্রতিষ্ঠিত রুটে’ চলছিল এবং গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল যে সেটি মাদক পাচারে সক্রিয়ভাবে জড়িত।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এসব অভিযানকে মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে একটি ‘সশস্ত্র সংঘাতের’ অংশ হিসেবে বর্ণনা করছে।

ট্রাম্প বারবার দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের দিকে মাদকের প্রবাহ বন্ধ করতে এসব হামলা প্রয়োজন।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জুলাইয়ে সিনেটে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, প্রতিটি হামলার সময় জাহাজে একজন করে আইন কর্মকর্তা থাকেন, যিনি হামলাটি আইনসম্মত কি না সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেন।

তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এসব হত্যাকাণ্ডের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

নিহতদের পরিবারও আদালতের দ্বারস্থ
মার্কিন হামলায় নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের পক্ষ থেকেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জানুয়ারিতে ত্রিনিদাদের দুই নাগরিক- ২৬ বছর বয়সী চ্যাড জোসেফ ও ৪১ বছর বয়সী রিশি সামারু- নিহত হওয়ার ঘটনায় তাদের পরিবার ম্যাসাচুসেটসের একটি ফেডারেল আদালতে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি আইনি সংগঠনের সহায়তায় করা মামলায় দাবি করা হয়, নিহত দুই ব্যক্তি ছিলেন জেলে।

এছাড়া গত বছরের ডিসেম্বরে কলম্বিয়ার নাগরিক আলেহান্দ্রো কারানজা মেদিনার পরিবারও আন্তঃআমেরিকান মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ দায়ের করে। কমিশনটি অরগানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটসের (ওএএস) একটি প্রতিষ্ঠান।

‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ বলতে কী বোঝায়?
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ শব্দটি ব্যবহারের কারণে বিষয়টি আরও গুরুতর আইনি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধ বলতে সাধারণত বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত হামলার অংশ হিসেবে সংঘটিত গুরুতর অপরাধ বোঝানো হয়। এর মধ্যে হত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর অপরাধ অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌযানে হামলাগুলো যদি কোনও পরিকল্পনা বা ধারাবাহিক নীতির অংশ হিসেবে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হয়ে থাকে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সে বিষয়ে অবগত থাকেন, তাহলে সেগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ার প্রশ্ন উঠতে পারে।

তবে জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকের প্রতিবেদন কোনও আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়। কোনও নির্দিষ্ট ঘটনায় অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, সেটি নির্ধারণের জন্য পৃথক আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণের প্রয়োজন হবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব?
এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) একটি সম্ভাব্য আইনি মঞ্চ হতে পারে। আদালত কোনও অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বিবেচনা করলে হামলার প্রকৃতি, তা কোনও বেসামরিক জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বা পদ্ধতিগত ছিল কি না এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি তার কর্মকাণ্ড সম্পর্কে কী জানতেন- এসব বিষয় পরীক্ষা করতে পারে।

তবে এখানে বড় একটি আইনি জটিলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্যরাষ্ট্র নয়। ফলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইসিসির এখতিয়ার প্রয়োগের প্রশ্নটি জটিল।

এখন পর্যন্ত কোনও মার্কিন নাগরিককে হেগের আইসিসিতে বিচার করা হয়নি।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব ফেডারেল আইনে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ নামে নির্দিষ্ট কোনও অপরাধের বিধান নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে মার্কিন আদালতেও এই নির্দিষ্ট অভিযোগে বিচার করার ক্ষেত্রে আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আইসিসির সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ
ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আইসিসির সম্পর্কও দীর্ঘদিন ধরে উত্তপ্ত।
গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পর ওয়াশিংটন আদালতটির সমালোচনা করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, আইসিসি এমন সব দেশের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে, যারা আদালতটির সদস্য নয়।

গত বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র এক ডজনের বেশি আইসিসি বিচারক ও কৌঁসুলির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। আদালতটির বিরুদ্ধেও আরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ফলে মাদক পাচারের অভিযোগে নৌযানে মার্কিন হামলা নিয়ে জাতিসংঘের সর্বশেষ প্রতিবেদন শুধু এসব অভিযানের বৈধতা নিয়েই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের মাদকবিরোধী সামরিক অভিযান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সূত্র: আল-জাজিরা

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ