সারা দেশে খাল পুনঃখনন ও উভয় পাড়ে নিবিড় সবুজ বনায়ন এবং নদী ও খালের ভাঙন রোধে বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টির মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে এসব খালের সংরক্ষণ ও তদারকিতে দীর্ঘমেয়াদে বিপুলসংখ্যক জনবল নিয়োগেরও একটি রূপরেখা তৈরি হচ্ছে। তবে শত শত কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন উদ্যোগটি আদতে কতটা কার্যকর হবে, নাকি তা সরকারি অর্থ অপচয়ের নতুন খাত তৈরি করবে—তা নিয়ে শুরুতেই সংশয় প্রকাশ করেন দেশের পরিবেশবিদরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এ কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষের সাময়িক ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। খালের পাড়ে গাছ ও বিন্নিঘাস রোপণ করে প্রাকৃতিক উপায়ে ভাঙন রোধের এ উদ্যোগ পরিবেশবান্ধব মনে হলেও অতীত অভিজ্ঞতার কারণে এটি বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখছেন জলবায়ু ও পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা।
অতীতের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের অনিয়ম ও তদারকির অভাবকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্ট মহল থেকে কিছু আশঙ্কা ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—অতীতে সরকারি উদ্যোগে খাল খনন ও বনায়নের পর রক্ষণাবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট কোনো নীতি ছিল না, যে কারণে অল্প কিছুদিনেই পুনরায় পলি জমে খাল ভরাট হয়ে গিয়েছিল। রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত না করে কেবল কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলে তা জনগণের ওপর করের বোঝা বাড়াবে। এটি যাতে না ঘটে, তা সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।
জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত অসচ্ছল ব্যক্তিরা কাজ পাবেন, নাকি রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি প্রাধান্য পাবে—প্রথমে তার সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। এ নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে পুরো কার্যক্রমই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এছাড়া যথাযথ নদীবিজ্ঞান ও স্থানীয় পরিবেশ পর্যালোচনা না করে পলি অপসারণ করা হলে তা আশপাশের নদীব্যবস্থাকে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই বিষয়টি নিশ্চিত করেই সরকারকে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (সিপিআরডি) প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা আমার দেশকে বলেন, প্রকল্প নেওয়া হলেও সরকারের পরিকল্পিত নীতির অভাবে তা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায় এবং মাঝপথে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় ঘটে। এ কার্যক্রম এটি যেন মাঝপথে থেমে না যায়, সেজন্য অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং স্থানীয় সরকারকে এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, খেয়াল রাখতে হবে যেন এ প্রকল্প কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। একে বাস্তবসম্মত করতে হলে খননকাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আবশ্যক। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় স্থানীয় জনগণকে সরাসরি যুক্ত করে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা না গেলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের এ মহাপরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সরকারের চলমান নদী-নালা, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন কার্যক্রমের মাধ্যমে যেসব সরকারি খাল পুনরুদ্ধার করা হচ্ছে, খননের পর সেগুলোকে কীভাবে টেকসইভাবে সংরক্ষণ ও জনকল্যাণে ব্যবহার করা যায়—এ ধারণাপত্রে তার একটি পরীক্ষামূলক মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন করে খাল খনন নয়, বরং পুনঃখনন করা খালকে পানি সংরক্ষণ, পরিবেশ রক্ষা, দুর্যোগ সহনশীল জীবিকা এবং অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের সম্পদে পরিণত করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
প্রথম পর্যায়ে দেশের আটটি বিভাগের ২০টি নির্বাচিত সরকারি খাল বা খালসমষ্টিকে মডেল হিসেবে নেওয়া হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এসব খালের মোট দৈর্ঘ্য হবে ৬০ কিলোমিটার। প্রতি এক কিলোমিটারকে একটি ব্যবস্থাপনা একক ধরে মোট ৬০টি ব্যবস্থাপনা একক গঠন করা হবে। প্রতিটিতে ২০ জন করে মোট ১,২০০ জনকে সম্পৃক্ত করা হবে। প্রতিটি ইউনিটে অন্তত ৫০ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নির্বাচিত খালের উপযোগিতা অনুযায়ী সেখানে সামাজিক বনায়ন, নিয়ন্ত্রিত মাছ ও হাঁস পালন, খালপাড়ে মৌসুমি সবজি চাষ, খাল রক্ষণাবেক্ষণ এবং জনসাধারণের বৈধ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। যেসব খালে নৌ চলাচল প্রযোজ্য, তা সচল রাখা হবে। তবে কোনো উৎপাদনমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে খালের পানিপ্রবাহ, ধারণক্ষমতা, নৌ চলাচল বা পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না।
এ উদ্যোগে অতিদরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কেবল আর্থিক সহায়তার পরিবর্তে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি, সমাজসেবা অধিদপ্তরের তালিকা এবং নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারসহ স্থানীয়ভাবে যাচাই করা অতিদরিদ্ররা এর সুফল পাবেন। তারা সমবায় বা ব্যবস্থাপনা দলের মাধ্যমে উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ, বনায়ন, হিসাব সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে অংশ নেবেন।
সরকারের প্রাথমিক অর্থায়নকে দীর্ঘমেয়াদি ভর্তুকি হিসেবে না দেখে সক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাইলট প্রকল্পের জন্য সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা প্রাথমিক সরকারি বিনিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অর্থ অবকাঠামো, উৎপাদন উপকরণ, সামাজিক বনায়ন, প্রশিক্ষণ, ঘূর্ণায়মান মূলধন, রক্ষণাবেক্ষণ, দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবীক্ষণে ব্যয় করা হবে। পরবর্তী সময়ে উৎপাদন থেকে আয় ও সমবায়ের নিজস্ব উদ্বৃত্তের মাধ্যমেই সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
পাশাপাশি সরকারি সম্পদের মালিকানা বা স্থায়ী দখল কোনো ব্যক্তি বা সমবায়ের কাছে হস্তান্তর করা হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী প্রচলিত আইন মেনে শর্তসাপেক্ষ, অহস্তান্তরযোগ্য ও প্রত্যাহারযোগ্য ব্যবস্থাপনা বা ব্যবহার অনুমতি দেওয়া হতে পারে। ২৪ মাস মেয়াদি এ পাইলট প্রকল্পের কাজ ধাপে ধাপে সম্পন্ন হবে।
শুরুতে খাল নির্বাচন, জমি ও মালিকানা যাচাই, পানিপ্রবাহ ও পরিবেশগত সক্ষমতা পরীক্ষা এবং জেলা প্রশাসনের অনাপত্তি নেওয়া হবে। এরপর উপকারভোগী নির্বাচন, সমবায় গঠন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশিক্ষণ শেষে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হবে। নিয়মিত পরিবীক্ষণের পাশাপাশি ১২ মাসে মধ্যবর্তী এবং ২৪ মাসে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্রকল্পের চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু আমার দেশকে বলেন, প্রকল্পের সাফল্য কেবল খরচের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা হবে না। কতজনের কর্মসংস্থান হলো, কত পরিবার আয় করতে পারল, উৎপাদন কত হলো, খাল কতটা সংরক্ষিত থাকল এবং নারীর সম্পৃক্ততা ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কতটুকু কমল—তার ওপর ভিত্তি করেই এ উদ্যোগের চূড়ান্ত কার্যকারিতা নির্ধারিত হবে।
তিনি আরো বলেন, কোনো দলীয় বিবেচনায় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে না, সবকিছুই হবে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার সঙ্গে।
বর্তমান সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদে দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির নির্বাচনি ইশতেহার রয়েছে। খাল খননসহ নানামুখী উদ্যোগের মাধ্যমে দৈনিক লাখ লাখ বেকার তরুণের কর্মসংস্থানের পথ এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে পূরণ করা হবে বলে সরকারের নীতিনির্ধারকরা জানান।