ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো যদি স্পেকট্রাম মূল্য কমিয়ে ডিজিটাল অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যেতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন ঝুঁকিপূর্ণ নীতি বেছে নেবে?
টেলিকম ব্যবসার প্রাণশক্তি স্পেকট্রাম; এর অযৌক্তিক দাম সরাসরি প্রভাব ফেলে গ্রাহকের পকেটে।
স্পেকট্রাম বা বেতার তরঙ্গকে টেলিযোগাযোগ শিল্পের প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। টেলিযোগাযোগ ব্যবসার অন্যতম মৌলিক উপাদান হওয়ায় তরঙ্গের মূল্যই নির্ধারণ করে দেয় যে, গ্রাহকেরা কী ধরনের সেবা গ্রহণ করতে পারবেন এবং সেই সেবার জন্য কত ব্যয় বহন করতে হবে। ফলে স্পেকট্রামের মূল্য অযৌক্তিকভাবে উচ্চ নির্ধারণ করা গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা করে না; বরং এটি সেবার ব্যয় বৃদ্ধি করে এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা গ্রাহকদের ওপরই বর্তায়। এই বাস্তবতা অনুধাবন করে বিশ্বের অনেক দেশ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণে আরও ভারসাম্যপূর্ণ, বিনিয়োগবান্ধব ও প্রগতিশীল নীতি গ্রহণ করেছে। তাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্পেকট্রাম মূল্যায়নের ক্ষেত্রে যেসব নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে, তা দেখে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
একটি উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে, দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবনের ক্ষেত্রে ভিয়েতনামের বেশ সুনাম রয়েছে। স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়।
২০২৫ সালের মে মাসে ভিয়েতনাম ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড স্পেকট্রামের নিলামে ১০ মেগাহার্টজের প্রতি ব্লকে প্রতি মেগাহার্টজের ভিত্তি মূল্য মাত্র ৯১.৮৫ কোটি টাকায় সফলভাবে বিক্রি করে, যা বাংলাদেশে ২০২৬ সালের একই স্পেকট্রামের দামের তুলনায় প্রায় তিন গুণ কম। ২০২৩ সালের জুনে ২৩০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিলাম ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকেই ভিয়েতনাম তাদের মূল্য নির্ধারণ কৌশল পুনর্বিবেচনা করে। সে সময় ২৩০০ ব্যান্ডের জন্য ভিত্তি মূল্য প্রতি মেগাহার্টজে ৮৬ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার ফলে অযৌক্তিক উচ্চ মূল্যের কারণে অপারেটররা ওই নিলামে অংশ নেয়নি।
২৩০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিলামের ব্যর্থ চেষ্টা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভিয়েতনাম ২৬০০ ব্যান্ড স্পেকট্রামের নিলামের সিদ্ধান্ত নেয় এবং স্পেকট্রামের ভিত্তি মূল্য প্রতি মেগাহার্টজে ১৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করে। ফলস্বরূপ, ২০২৪ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত ২৬০০ ব্যান্ডের নিলামটি ব্যাপক সফল হয়। অথচ একই ২৬০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম বাংলাদেশে তিন গুণ বেশি মূল্যের ছিল।
এর ফলাফল ছিল অত্যন্ত ইতিবাচক ও বিস্ময়কর। নিলামের মাত্র এক বছরের মধ্যে ভিয়েতনামে মোবাইলের গড় ডাউনলোড গতি ৫৭ এমবিপিএস থেকে বেড়ে ১৫২ এমবিপিএসে উন্নীত হয়। এর ফলে দেশটি বিশ্বব্যাপী ২৬ ধাপ এগিয়ে ১৬তম স্থানে উঠে আসে।
পাকিস্তানে স্পেকট্রাম মূল্যের কৌশলগত পরিবর্তন
২০২৬ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তান একটি সফল স্পেকট্রাম নিলাম আয়োজন করে। এতে ৭০০, ১৮০০, ২৩০০, ২৬০০ ও ৩৫০০ ব্যান্ডে মোট ৫৯৭.২ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম নিলামে তোলা হয়। এর মধ্যে ৮০.৪ শতাংশ বিক্রি হয়। ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৬ সালের নিলামে পাকিস্তান ১৮০০ ব্যান্ডের ভিত্তিমূল্য ৫৫ শতাংশ এবং ২১০০ ব্যান্ডের ভিত্তিমূল্য ৫২ শতাংশ কমায়। এই হিসাব করা হয়েছে মার্কিন ডলারের মূল্যে। বাংলাদেশের তুলনায় ১৮০০ ব্যান্ডের দাম প্রায় ৯১ কোটি টাকা এবং ২১০০ ব্যান্ডের দাম ৭৪ কোটি টাকা কম রাখা হলেও, ১৮০০ ও ২১০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রামের জন্য কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, পাকিস্তানের ২০২৬ সালের স্পেকট্রাম নিলামের সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশে স্পেকট্রামের সর্বশেষ মূল্য ৭০০ ব্যান্ডে তিন গুণ বেশি (২৩৭ কোটি টাকা বনাম ৮০ কোটি টাকা), ১৮০০ ব্যান্ডে ১.৫ গুণ বেশি (২৬৩ কোটি টাকা বনাম ১৭২ কোটি টাকা), ২৩০০ ব্যান্ডে ৪.৭ গুণ বেশি (৫৮ কোটি টাকা বনাম ১২.৩ কোটি টাকা) এবং ২৬০০ ব্যান্ডে ৩.৮ গুণ বেশি (৫৮ কোটি টাকা বনাম ১৫.৪ কোটি টাকা) ছিল।
সস্তা স্পেকট্রামে ইন্দোনেশিয়ার ডিজিটাল অগ্রযাত্রা
২০২৬ সালের ১০ জুলাই ইন্দোনেশিয়া ৭০০ মেগাহার্টজ ও ২৬০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম ব্যান্ডের নিলাম পরিচালনা করে। ৭০০ ব্যান্ডের জন্য সর্বোচ্চ দর ছিল প্রতি মেগাহার্টজে ৩৬ কোটি টাকা এবং ২৬০০ ব্যান্ডের জন্য ছিল ৬.৯৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশের তুলনায় ইন্দোনেশিয়ায় ৭০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম ৬.৬ গুণ এবং ২৬০০ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম ৮ গুণ সস্তা ছিল।
বাংলাদেশের তুলনায় ইন্দোনেশিয়ায় গ্রাহকপ্রতি গড় রাজস্ব প্রায় দ্বিগুণ, গ্রাহকসংখ্যা ১.৭৫ গুণ বেশি এবং এই খাতের মাসিক আয় প্রায় ৩.৭ গুণ বেশি। দেশটিতে স্মার্টফোন ব্যবহারের হারও প্রায় ১০০ শতাংশ। পাশাপাশি সেখানে সেবার পরিসর অনেক বড়, ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুযায়ী মাথাপিছু জিডিপি বাংলাদেশের তুলনায় ১.৭ গুণ বেশি, করপোরেট কর প্রায় অর্ধেক এবং গ্রাহকের ওপর কর তিন গুণেরও বেশি কম। এত শক্তিশালী বাজারভিত্তি ও আর্থিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়া স্পেকট্রামের মূল্য কম রেখে বৈশ্বিক প্রবণতার সঙ্গেই নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ রেখেছে।
স্পেকট্রাম মূল্যের বৈশ্বিক ধারা ও বাংলাদেশ
জিএসএমএ-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এক দশক আগের তুলনায় প্রতি মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম থেকে অর্জিত রাজস্ব বিশ্বব্যাপী প্রায় ৭৫ শতাংশ কমে গেছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা নেরার মতে, ২০১৭ সাল থেকে অধিকাংশ দেশ স্পেকট্রামের সরবরাহ ৬০ শতাংশ বা তার বেশি বাড়িয়েছে। স্পেকট্রামের এই বর্ধিত সরবরাহের কারণে এর দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এদিকে জিএসএমএ সতর্ক করেছে, বাংলাদেশে বর্তমান দাম বহাল থাকলে ২০২৭ সালের মধ্যে স্পেকট্রাম খরচ অপারেটরদের মোট রাজস্বের ২৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বিনিয়োগ ও স্পেকট্রাম লাইসেন্সের মেয়াদ
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা গেছে, ভবিষ্যতে স্পেকট্রাম ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে অপারেটরদের বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যায়। তাই অপারেটররা স্পেকট্রামে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা চান।
উদাহরণস্বরূপ, ভারতে প্রাথমিক ২০ বছর মেয়াদের জন্য লাইসেন্স দেওয়া হয়, যা প্রশাসনিক অনুমোদন সাপেক্ষে আরও ১০ বছর বাড়ানো যায়। স্পেনে প্রাথমিক ২০ বছরের মেয়াদের পর পরবর্তী অতিরিক্ত ২০ বছরের জন্য নবায়নের সুযোগ রয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রায় ৪০ বছরের একটি অত্যন্ত স্থিতিশীল ও প্রায় স্বয়ংক্রিয় বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে। যুক্তরাজ্যে মোবাইল স্পেকট্রাম লাইসেন্সের কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই, অর্থাৎ এগুলো অনির্দিষ্টকাল কার্যকর থাকে।
উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত নিশ্চয়তা প্রদান এবং উন্নত মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ৫জি চালুর টেকসই বিনিয়োগকে সমর্থন করার জন্য স্পেকট্রাম লাইসেন্সের সর্বনিম্ন ২০ বছরের মেয়াদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
উপরে আলোচিত বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, বিশ্বের অধিকাংশ দেশ ডিজিটাল সুবিধা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে স্পেকট্রামের মূল্য কমানোর পথ বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণ বিষয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তই ডিজিটাল ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করবে। সরকার যে পথই বেছে নিক না কেন, তা দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, তার একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন হিসেবে বিবেচিত হবে।
স্পেকট্রামের মূল্য: বাংলাদেশ কি বৈশ্বিক প্রবণতা এড়িয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পথেই এগোবে?
চীনা যুদ্ধজাহাজের শুভেচ্ছা সফর: বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান
সংকট যখন সবার, সমাধান কেন শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য
পাকিস্তানের স্কলারশিপ কেলেঙ্কারি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার দায় কার?