একসময় রাজশাহী নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিল ছোট-বড় অসংখ্য পুকুর ও জলাধার। নগরায়ণের বিস্তারের সঙ্গে একের পর এক এসব জলাধার ভরাট করে গড়ে উঠেছে বহুতল ভবন, মার্কেট, আবাসিক স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো। বিভিন্ন গবেষণা, সরকারি নথি ও স্থানীয় পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে নগরীতে থাকা প্রায় ৯৫২টি পুকুরের মধ্যে বর্তমানে টিকে আছে প্রায় ২০০টি।
পরিবেশসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের হিসাবে, গত এক দশকেই প্রায় ৮০০ পুকুর ভরাট করা হয়েছে। জলাধার কমার পাশাপাশি গত কয়েক দশকে নগরীর সবুজ এলাকাও কমেছে। এর প্রভাব পড়ছে পানি নিষ্কাশন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ ও স্থানীয় তাপমাত্রার ওপর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুকুর ভরাট বন্ধে প্রশাসনের অভিযান, জরিমানা ও আইনি বিধান থাকলেও পুরোপুরি থামছে না এ প্রবণতা। কোথাও অভিযান চালিয়ে ভরাট বন্ধ করা ও পুকুর পুনরুদ্ধার করা হলেও কিছুদিন পর আবারও সেখানে মাটি ফেলার অভিযোগ উঠছে। নগরীর হড়গ্রাম এলাকার প্রায় দুই বিঘা আয়তনের একটি পুকুর এর উদাহরণ।
গত বছর পুকুরটি ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। পরে একই বছরের নভেম্বরে বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে পুকুরটি পুনরুদ্ধার করা হয়। কিন্তু এর কিছুদিন পর আবারও সেখানে মাটি ফেলার অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান শেষ হওয়ার পর নিয়মিত নজরদারি না থাকায় অনেক সময় রাতের আঁধারে ট্রাক বা অন্য যানবাহনে করে মাটি এনে জলাধারে ফেলা হয়। কোথাও ময়লা-আবর্জনা ও নির্মাণসামগ্রী ফেলে ধীরে ধীরে জলাধারের গভীরতা কমিয়ে আনার অভিযোগও রয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে এমনভাবে পুকুর, ডোবা ও প্রাকৃতিক জলাধার ভরাটের অভিযোগ রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় একটি পুকুর ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হলে জমির আর্থিক মূল্য কয়েক গুণ বেড়ে যায়। ফলে আর্থিক লাভের আশায় প্রভাবশালী মহলের কিছু লোক জলাধার ভরাটে ঝুঁকছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
নগরীর বাসিন্দা মুকুল আলী বলেন, ‘আগে আমাদের এলাকায় অনেক পুকুর ছিল, কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তির কারণে সেগুলো ভরাট হয়ে গেছে। প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, অভিযানের পর নিয়মিত নজরদারি না করলে পুকুর রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।’
আরেক বাসিন্দা আরাফাত হোসেন বলেন, ‘একসময় রাজশাহী নগরীতে অনেক পুকুর ছিল। এখন বাড়িঘর, মার্কেট ও বহুতল ভবন নির্মাণের কারণে একের পর এক পুকুর হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে নগরীর জনসংখ্যা ও স্থাপনা আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. চন্দন রায় বলেন, ‘রাজশাহী নগরীতে পুকুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। এর অন্যতম কারণ নতুন নতুন বহুতল ভবন নির্মাণ ও দ্রুত নগরায়ণ। নগরীতে জনসংখ্যার চাপও বেড়েছে।
তিনি বলেন, রাজশাহীতে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকায় আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ শিক্ষা, চাকরি ও আবাসনের প্রয়োজনে নগরীতে আসছেন। ফলে আবাসন ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার চাহিদা বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে জলাধার ও খোলা জায়গার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।’
অধ্যাপক চন্দন রায় বলেন, ‘পুকুর শুধু পানি ধরে রাখার জায়গা নয়; প্রতিটি পুকুরের নিজস্ব একটি প্রতিবেশব্যবস্থা রয়েছে। বৃষ্টির সময় পুকুর প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ করে এবং নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে জলাধার নগরের স্থানীয় তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। পুকুর ও জলাভূমি কমে গেলে আরবান হিট আইল্যান্ড বা নগর তাপদ্বীপের প্রভাব বাড়তে পারে। এতে নগরের তাপমাত্রা আরও বেশি অনুভূত হতে পারে এবং জলজ ও স্থলজ জীববৈচিত্র্যেরও ক্ষতি হতে পারে।’
নগরীর জলাধার কমার সঙ্গে সবুজ এলাকার পরিবর্তনের চিত্রও উঠে এসেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায়। গবেষণায় গত কয়েক দশকে নগরীর সবুজ এলাকা, জলাধার ও নির্মিত এলাকার পরিবর্তন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, গত তিন দশকে রাজশাহী নগরীর সবুজ এলাকা প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে নির্মিত এলাকার পরিমাণ ৯ দশমিক ৭৩ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে প্রায় ২২ দশমিক ৯৯ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছেছে। জলাধারও কমেছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ সালে নগরীতে সর্বোচ্চ ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। পরবর্তী বছরগুলোতেও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির আশপাশে বা এর বেশি ছিল। ২০০৭ সালে ৪২ দশমিক ০২, ২০০৯ সালে ৪১ দশমিক ০৮, ২০১০ সালে ৪২ দশমিক ৫, ২০১২ সালে ৪২, ২০১৪ সালে ৪২ দশমিক ৬, ২০২৩ সালে ৪২ দশমিক ৬ এবং ২০২৪ সালে ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। সর্বশেষ ২০২৬ সালে সর্বোচ্চ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাপমাত্রার ওঠানামাকে পুকুর কমে যাওয়ার একক ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি স্থানীয় ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তনও নগরের তাপীয় পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। জলাধারের পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আশপাশের পরিবেশকে তুলনামূলক শীতল রাখতে সহায়তা করে। বিপরীতে কংক্রিট, ইট, পিচসহ নির্মিত পৃষ্ঠ সূর্যের তাপ শোষণ করে ধরে রাখে। ফলে সবুজ এলাকা ও জলাধার কমে এবং নির্মিত এলাকা বাড়লে নগরের কিছু এলাকায় তাপীয় অস্বস্তি বাড়তে পারে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারাও বলছেন, পুকুর কমে যাওয়ায় অগ্নিনির্বাপণে বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, দ্রুত নগরায়ণের কারণে অনেক পুকুর ভরাট করে সেখানে মার্কেট, বহুতল ভবন ও আবাসিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে। কিছু ভবনে ভূগর্ভস্থ রিজার্ভ বা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকলেও অগ্নিকাণ্ডের সময় খোলা পানির উৎস ফায়ার সার্ভিসের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই নগরীতে টিকে থাকা পুকুর ও অন্যান্য পানির উৎস সংরক্ষণ জরুরি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি-বেলার তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী বিভাগের বেশ কয়েকটি নদী বর্তমানে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে স্থানীয়ভাবে শতাধিক খাল-বিল ও নদীনালা দখল ও ভরাটের অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, নদী, খাল, বিল ও পুকুর একটি বৃহত্তর জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ। এসব জলাধার হারিয়ে গেলে বৃষ্টির পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের স্বাভাবিক ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়তে পারে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণের ওপরও।
বেলার রাজশাহী সমন্বয়কারী তন্ময় কুমার সান্যাল বলেন, ‘রাজশাহীতে গরমের সময় অতিরিক্ত গরম এবং শীতের সময় বেশি শীত অনুভূত হওয়ার পেছনে জলাশয় ও প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে। নদী, খাল ও বিলের ওপর মানুষের বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড স্থানীয় পরিবেশ ও আবহাওয়াকে প্রভাবিত করছে। তবে মানবসৃষ্ট কারণের পাশাপাশি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।’
অন্যদিকে নগরীর পুকুর ভরাটের পাশাপাশি জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমিতে অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খননের বিষয়টিও পরিবেশবিদদের উদ্বেগের কারণ। মাছ চাষের জন্য কৃষিজমি কেটে পুকুর তৈরি হলে কৃষিজমি কমার পাশাপাশি স্থানীয় ভূমি ব্যবহার ও পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আসে। একইভাবে সড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে গাছ কাটা হলে সবুজ আচ্ছাদন কমতে পারে। তাই উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের সময় অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজশাহী অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মহিনুল হাসান বলেন, ‘পুকুর ভরাটের কোনো তথ্য প্রশাসনের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কোনো পুকুর ভরাটের পর্যায়ে নিয়ে গেলে সেটি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। গত দুই বছরে রাজশাহী মহানগরীর কোনো পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তন করা হয়নি। পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তনের জন্য অনেক আবেদন এলেও কোনোটিই অনুমোদন দেওয়া হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘একটি পুকুরের শ্রেণি পরিবর্তনের অনুমতি দেওয়া হলে সেটি অন্যদেরও পুকুর ভরাটে উৎসাহিত করতে পারে। নগরীর অবশিষ্ট জলাধার রক্ষার স্বার্থেই শ্রেণি পরিবর্তনের আবেদন অনুমোদন না দেওয়ার নীতি নেওয়া হয়েছে।’
রাজশাহী বোয়ালিয়া থানার সহকারী ভূমি কর্মকর্তা রাহাতুল কবির মিজান বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। আমার এলাকায় পুকুর ভরাটের এসব ঘটনার অনেকগুলো আগের এসিল্যান্ডের সময়ে হয়েছে। রাজশাহীর পুকুর রক্ষায় শুধু প্রশাসনিক অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ব্যবস্থা। একটি পুকুর ভরাটের সময় অভিযান চালিয়ে মাটি সরিয়ে দেওয়ার পর সেখানে আবার মাটি ফেলা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।’
তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে পুকুরগুলোর হালনাগাদ ডিজিটাল তালিকা তৈরি, স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, ভূমির শ্রেণি পরিবর্তনের ওপর কঠোর নজরদারি এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি পুকুরের মালিকানা, দাগ, খতিয়ান, আয়তন ও অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করা প্রয়োজন।’
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি পুকুর-জলাশয় ভরাট করে রাতারাতি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজশাহীতে কারা এভাবে পুকুর ভরাট করে অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন, তা নগরবাসীর অনেকেরই জানা। এসব জলাশয় যেন আর কেউ ভরাট করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘রাজশাহীকে আধুনিক, বাসযোগ্য, সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে জলাধার রক্ষা করা জরুরি।’