একসময় স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার। বাবাও চেয়েছিলেন মেয়ে চিকিৎসক হোক। কিন্তু নবম শ্রেণিতে একটি সিনেমার অডিশনে অংশ নেওয়ার পর বদলে যায় মামিথা বাইজুর জীবনের গল্প। সেই অডিশনই তাঁকে নিয়ে আসে অভিনয়ের জগতে। আর ২০২৬ সালে এসে এক বছরে তিনটি ২০০ কোটি রুপির সিনেমার অভিনেত্রী হিসেবে আলোচনায় তিনি।
মামিথা বাইজুর জন্ম ২০০১ সালের ২২ জুন ভারতের কেরালার কোট্টায়াম জেলার কিডাঙ্গুরে। বাবা ড. বাইজু কৃষ্ণন একজন চিকিৎসক, মা মিনিও পরিবার ও সন্তানদের দেখাশোনা করতেন। তাঁর বড় ভাইয়ের নাম মিথুন। ছোটবেলা থেকেই নাচের প্রতি ছিল মামিথার গভীর আগ্রহ। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই নাচ শেখা শুরু করেন। স্কুল ও রাজ্য পর্যায়ের বিভিন্ন নৃত্য প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও পেয়েছেন।
পরিবারের ইচ্ছা ছিল, পড়াশোনা শেষ করে মামিথা চিকিৎসক হবেন। বাবার ক্লিনিকে ছোটবেলা থেকেই রোগীদের দেখতেন তিনি। বাবার চিকিৎসক পরিচয়ও তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। একসময় রোগীরা মজা করে তাঁকে ‘বেবি ডাক্তার’ বলেও ডাকতেন। চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছা তাঁর নিজেরও ছিল।
কিন্তু নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় হঠাৎ আসে সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ। বাবার বন্ধু ও প্রযোজক অজি আলাপ্পাট্টুকুন্নেলের মাধ্যমে ‘সার্ভোপরি পালাক্কারান’ সিনেমার অডিশনে অংশ নেন মামিথা। সিনেমায় অভিনয়ের কোনো বড় স্বপ্ন তখন তাঁর ছিল না। কেবল সিনেমার শুটিং কীভাবে হয়, সেটি দেখার কৌতূহল থেকেই অডিশনে গিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হয়ে যান।
মেয়ের অভিনয়ের সুযোগ নিয়ে শুরুতে দ্বিধায় ছিলেন তাঁর বাবা। কারণ মামিথা পড়াশোনায় ভালো ছিলেন এবং তাঁকে চিকিৎসক হিসেবে দেখতে চেয়েছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করে দেখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কাজ করতে গিয়ে পরিচালক ও সহকর্মীদের কাছ থেকে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পাওয়ার পর ধীরে ধীরে অভিনয়কেই পেশা হিসেবে বেছে নেন মামিথা।
২০১৭ সালে ‘সার্ভোপরি পালাক্কারান’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় তাঁর। এরপর ‘হানি বি ২’, ‘অপারেশন জাভা’, ‘খো খো’, ‘সুপার শরণ্যা’, ‘প্রণয় বিলাসাম’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় অভিনয় করেন। তবে ক্যারিয়ারের বড় বাঁক আসে ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘প্রেমালু’ দিয়ে। নাসলেনের সঙ্গে জুটি বেঁধে রীণু চরিত্রে অভিনয় করে দক্ষিণী দর্শকদের কাছে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি।
‘প্রেমালু’র সাফল্যের পর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি মামিথাকে। মালয়ালমের পাশাপাশি তামিল সিনেমাতেও কাজ শুরু করেন তিনি। বিজয়ের ‘জনা নায়কান’ ও সূরিয়ার ‘বিশ্বনাথ অ্যান্ড সন্স’-এর মতো বড় সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ পান। একই সঙ্গে ‘প্রেমালু’র পরিচালক গিরিশ এডির সঙ্গে আবারও কাজ করেন ‘বেথলেহেম কুদুম্বা ইউনিট’-এ, যেখানে তাঁর সহশিল্পী নীভিন পলি।
২০২৬ সালেই যেন বদলে গেছে মামিথার ক্যারিয়ারের হিসাব। *দ্য ইকোনমিক টাইমস*–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘জনা নায়কান’, ‘বিশ্বনাথ অ্যান্ড সন্স’ ও ‘বেথলেহেম কুদুম্বা ইউনিট’—তিন সিনেমাই বিশ্বব্যাপী ২০০ কোটি রুপির বেশি আয় করেছে বলে শিল্পসংশ্লিষ্ট হিসাব রয়েছে। ‘বেথলেহেম কুদুম্বা ইউনিট’ মাত্র ১১ দিনেই ২০০ কোটি রুপির মাইলফলক পার করেছিল বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এর মধ্যে ‘বেথলেহেম কুদুম্বা ইউনিট’ এখন আরও বড় সাফল্যের পথে। ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সিনেমাটির বিশ্বব্যাপী আয় ৩১০ কোটি রুপি ছাড়িয়েছে বলে *টাইমস অব ইন্ডিয়া* জানিয়েছে। *দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস*-ও সিনেমাটির আয় ৩১০ কোটি রুপি ছাড়ানোর খবর প্রকাশ করেছে।
এক বছরে তিনটি ২০০ কোটি রুপির সিনেমায় অভিনয়ের এই সাফল্যকে ঘিরে মামিথাকে নিয়ে বিশেষ আলোচনা শুরু হয়েছে। *টাইমস অব ইন্ডিয়া* জানিয়েছে, তিনি একই বছরে তিনটি ২০০ কোটি রুপির সিনেমায় অভিনয় করা দক্ষিণ ভারতের প্রথম অভিনেত্রী এবং দীপিকা পাড়ুকোন ও আলিয়া ভাটের পর এমন কীর্তি করা তৃতীয় ভারতীয় অভিনেত্রী।
তবে মামিথার গল্প শুধু বক্স অফিসের সংখ্যায় আটকে নেই। একজন চিকিৎসকের মেয়ে, ছোটবেলা থেকে নাচের প্রতি আগ্রহ, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল অন্য পথে এগোনোর প্রস্তুতি। নবম শ্রেণির একটি অডিশন সেই পথ বদলে দেয়। যে মেয়েটি একসময় বাবার মতো চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনিই এখন দক্ষিণী সিনেমার বড় তারকাদের সঙ্গে পর্দা ভাগ করে নিচ্ছেন।
আর ২০২৬ সালে তাঁর নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও বড় পরিচয়—২০০ কোটি রুপির সিনেমার নায়িকা।