ঢাকা, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ (বাসস) : ব্রাজিলের সুপ্রিম কোর্টের দুই বিচারপতির মধ্যে নজিরবিহীন দ্বন্দ্ব দেশটির সর্বোচ্চ আদালতে তীব্র সংকট তৈরি করেছে। অক্টোবরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই বিরোধ এরই মধ্যে আদালতের ভেতর ও দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
একটি বড় ধরনের জালিয়াতি কেলেঙ্কারির তদন্তকে কেন্দ্র করে এই সংকটের সূত্রপাত। এর প্রভাব পড়েছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারেও। নির্বাচনে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কট্টর ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো।
মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে দুই বিচারপতি মুখোমুখি অবস্থানে থাকবেন। অধিবেশনটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।
একদিকে রয়েছেন আলেকজান্দ্রে দে মোরেস, যিনি বলসোনারো পরিবারের সবচেয়ে ঘোর রাজনৈতিক ও আইনি প্রতিপক্ষ হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে রয়েছেন আন্দ্রে মেন্ডোনকা, যাকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ দিয়েছিলেন জাইর বলসোনারো।
দুই বিচারপতির মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধ শুরু হয় প্রায় দুই সপ্তাহ আগে। সেদিন মেন্ডোনকা একটি পুলিশের প্রতিবেদন প্রকাশ্যে আনেন। ওই প্রতিবেদনে কারাগারে থাকা ব্যাংকার ড্যানিয়েল ভোরকারোর পাঠানো কিছু বার্তা প্রকাশ করা হয়, যা তিনি মোরেসের বলে কথিত একটি নম্বরে পাঠিয়েছিলেন। একটি জালিয়াতির তদন্তের মুখোমুখি হওয়ায় তিনি সেই বার্তায় বিচারপতির সাহায্য চেয়েছিলেন।
এর জবাবে মোরেস মেন্ডোনকার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তোলেন।
কঠোর দৃষ্টির কারণে ‘জান্দাও’—অর্থাৎ ‘বিগ অ্যালেক্স’—নামে পরিচিত আলেকজান্দ্রে দে মোরেস বর্তমানে ব্রাজিলের অন্যতম ক্ষমতাধর এবং সবচেয়ে বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব।
দেশটির প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বা বিচারিক সংঘাতেই তার উপস্থিতি দেখা গেছে। ফলে ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যমে তিনি প্রায় নিয়মিতই শিরোনামে থাকেন।
গত বছর তিনি সেই বিচারপ্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেন, যার ফল হিসেবে সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোকে ক্ষমতা দখলের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টায় ভূমিকার জন্য ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এর আগে ২০২৩ সালে ব্রাজিলের নির্বাচনী আদালতের প্রধান হিসেবে মোরেস ক্ষমতার অপব্যবহার ও গণমাধ্যমের অপব্যবহারের অভিযোগে বলসোনারোকে সরকারি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে নিষিদ্ধ করেছিলেন।
মোরেস ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ নিয়ে তদন্তের নেতৃত্বও দিয়েছেন। অনলাইনে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ঠেকাতে তিনি কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, যার মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করার ঘটনাও রয়েছে।
২০২৪ সালে তার নির্দেশে ব্রাজিলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স ৪০ দিনের জন্য বন্ধ ছিল। প্ল্যাটফর্মটি ভুল তথ্য ছড়ানো ঠেকাতে দেওয়া আদালতের নির্দেশ মানতে ব্যর্থ হওয়ার পর এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
দেশটির ডানপন্থীরা অভিযোগ করে আসছে, মোরেস তার ক্ষমতা ব্যবহার করে অনলাইনে রক্ষণশীল মতামত দমন করছেন। কিছু মানবাধিকার সংগঠনও বিচারিক ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে।
জাইর বলসোনারো নিজে মোরেসকে ‘দুর্বৃত্ত’ এবং ‘স্বৈরশাসক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
২০১৭ সালে মধ্য-ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল তেমের মোরেসকে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে মনোনীত করেন। এর আগে মোরেস তেমের সরকারের আইনমন্ত্রী ছিলেন। সে সময় বামপন্থীদের একটি অংশ তার নিয়োগের বিরোধিতা করেছিল।
তবে ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ভুল তথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলায় মোররসের ভূমিকার প্রশংসা করেন প্রেসিডেন্ট লুলা।
মোরেসের কর্মকাণ্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গেও বিরোধ তৈরি হয়েছে। বলসোনারোর বিচারপ্রক্রিয়ায় ভূমিকার কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ট্রাম্প এই বিচারকে তার মিত্র বলসোনারোর বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।
পরে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে মোরেস প্রকাশ্যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য লুলাকে ধন্যবাদ জানান।