ইয়েমেনের ছোট্ট দ্বীপ পেরিমে পা রাখলে মনে হয়, ইতিহাসের কোনো পুরোনো অধ্যায়ে ফিরে যাওয়া হয়েছে। বালু আর পাথরে ভরা দ্বীপটির অবস্থান আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিতে হঠাৎই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পেরিম দ্বীপটি বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে অবস্থিত। লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলের এই সরু জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
সৌদি আরব এরই মধ্যে হরমুজ এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল রপ্তানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা এবং তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা।
কিন্তু এখন সেই বিকল্প পথও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দ্বীপটি তাদের নিয়ন্ত্রণে গেলে লোহিত সাগরের দিকে যাওয়া জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা তারা পেতে পারে।
পেরিম দ্বীপটি বাব আল-মান্দাব প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের কাছে অবস্থিত। এখানে আরব উপদ্বীপের কাছাকাছি চলে এসেছে আফ্রিকার হর্ন অঞ্চল। দুই ভূখণ্ডের দূরত্ব কিছু জায়গায় মাত্র ১২ মাইল।
এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শত শত বছর ধরে দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় ভারতগামী জাহাজের কয়লা সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে পেরিম। দ্বীপটির পুরোনো স্থাপনাগুলোতে এখনো সেই ঔপনিবেশিক সময়ের চিহ্ন দেখা যায়।
বর্তমানে পেরিমের নিয়ন্ত্রণ ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনীর হাতে। তবে দ্বীপটির চারপাশের পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) হুথিরা পেরিমের উত্তরে গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় শহর মোচা দখল করেছে। শহরটি পেরিম থেকে প্রায় ৫০ মাইল উত্তরে।
ইয়েমেনে এক দশকের বেশি সময় ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। হুথিরা রাজধানী সানা এবং দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। লোহিত সাগরের উপকূলেরও বড় একটি অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জুলাই থেকে হুথিরা ইয়েমেনের সরকারের বিরুদ্ধে নতুন করে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেছে। এর ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে হুথিদের চার বছরের অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিও নড়বড়ে হয়ে গেছে।
ইয়েমেনের সরকারের একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট তারিক সালেহ বলেছেন, পেরিম দখল হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। তখন হুথিদের সরাতে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক বাহিনী ও নৌবাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে।
সালেহর মতে, আগে ইয়েমেনের সংঘাতকে শুধু স্থানীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখা হলেও এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। তার কথায়, বিষয়টি এখন ভূরাজনৈতিক।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সে সময় হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে। পরের বছর সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু হয়।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে। গোষ্ঠীটির ওপর তেহরানের প্রভাবও রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, হুথিদের সব কার্যক্রমকে শুধু ইরানের নির্দেশ হিসেবে দেখলে বিষয়টি পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
ইয়েমেনের বিশ্লেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেছেন, হুথিদের নিজেদেরও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কারণ রয়েছে। তার মতে, দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো থেকে মানুষের দৃষ্টি সরানো, সৌদি আরবকে আবার আলোচনায় ফেরানো এবং ইরানের মতো পুরোনো মিত্রকে সহায়তা করা—সবকিছুই হুথিদের সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাব আল-মান্দাব দিয়ে তেল পরিবহন এরই মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তিন বছর আগে বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবহন করা তেলের প্রায় ১০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে যেত।
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, এরপর সেই পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।
হুথিদের হামলা দীর্ঘস্থায়ী হলে এই পথ দিয়ে তেল পরিবহন আরও কমে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে গেলে জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের চাপ বাড়তে পারে। তারা প্রণালিতে মাইনও পেতে পারে বলে ইয়েমেনের সরকারি কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন।
একজন সরকারি কর্মকর্তার ভাষ্য, পেরিমের নিয়ন্ত্রণ পেলে জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে তাদের দূরপাল্লার অস্ত্রের প্রয়োজন না-ও হতে পারে।
পেরিমের কাছের মোচা বন্দরও সাম্প্রতিক সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্দরটির পরিচালক আবদেল মালেক আল-শারাবির তথ্য অনুযায়ী, কয়েক সপ্তাহ আগে হুথিদের ২৫টির বেশি রকেট বন্দরে আঘাত হানে।
সে সময় বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বন্দরে পণ্য ওঠানামা করছিল। হামলায় ১৬ জন নিহত এবং ২২ জন আহত হন। ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যায়।
এ ছাড়া প্রায় ১৪ হাজার মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। বন্দরের পরিচালক বলেন, এই হামলার লক্ষ্য ছিল অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে ক্ষতিগ্রস্ত করা।
ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, হুথিরা পেরিম দখল করলে বাব আল-মান্দাবের ওপর তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়ে যাবে। তখন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও নৌপথে মাইন পেতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইয়েমেনের সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, ইরান থেকে হুথিদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছাচ্ছে। এর মধ্যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ব্যবস্থা ও ড্রোনের যন্ত্রাংশ রয়েছে বলে তাদের দাবি।
হুথিদের হাতে সমুদ্রপথে হামলার সক্ষমতা বাড়তে থাকলে তেলবাহী ট্যাংকারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পেরিম ও বাব আল-মান্দাবকে ঘিরে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে এর প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে পড়তে পারে।
ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তা তারিক সালেহ সতর্ক করে বলেছেন, হুথিদের পেরিম থেকে সরাতে দেরি হলে ভবিষ্যতে এর মূল্য শুধু ইয়েমেনকেই নয়, যুক্তরাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বৈশ্বিক বাণিজ্যকেও দিতে হতে পারে।