মধ্যেপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ হলেও আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ১২০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে কর্মক্ষম ৪০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করবে, ফলে ৮০ কোটি মানুষের চাকরির ঘাটতি থেকে যাবে।
মাস্টারকার্ডের সাবেক এই সিইও কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে বিশ্ব অর্থনীতিতে বিপর্যয় নেমে আসে বলেন জানান। এর সঙ্গে ধারাবাহিক স্বল্পমেয়াদী ধাক্কার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদী বিষয়ের ওপর মনোনিবেশ করানো একটি কঠিন কাজ বলে জানান।
তিনি বলেন, আর্থিক কর্মকর্তারা যেন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মানুষকে বিদ্যুৎ গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা এবং বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার মতো দীর্ঘমেয়াদী চ্যালেঞ্জগুলোর ওপর মনোযোগ ধরে রাখেন। আমাদের একই সঙ্গে হাঁটতে ও চুইংগাম চিবোতে হচ্ছে। আমরা এখন একটি স্বল্প গতির চক্রের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। দীর্ঘগতির চক্রটি হলো এই চাকরির পরিস্থিতির উন্নতি করা।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের ছায়ায় এই সপ্তাহে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বসন্তকালীন বৈঠকে যোগ দিতে সারাবিশ্ব থেকে হাজার হাজার অর্থ কর্মকর্তা ওয়াশিংটনে সমবেত হবেন। এই যুদ্ধ বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার নিম্নমুখী এবং এবং মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে যায়। অর্থনীতিতে এর প্রভাব কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্বের ওপর।
এই যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই ট্রাম্প ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কার্যকর অবরোধের অবসান ঘটাতে পারেনি, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে আসে। এছাড়াও তিনি লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে চলমান সংঘাত শান্ত করতে পারেনি।
বিশ্বব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ, উন্নয়ন কমিটি, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে এমন নীতি ও নিয়ন্ত্রক শর্তাবলী সহজ করার জন্য কাজ করার পরিকল্পনা তুলে ধরেছে, যা বছরের পর বছর ধরে বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বাধা সৃষ্টি করেছে।
বাঙ্গা বলেন, আলোচনায় অনুমতি সংক্রান্ত স্বচ্ছতা, দুর্নীতি দমন, শ্রম আইন, ভূমি আইন, ব্যবসা খোলার প্রতিবন্ধকতা, সরবরাহ ব্যবস্থা, উন্নত বাণিজ্য ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মূল্য-বহির্ভূত বাধার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তিনি আশাবাদী তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে এবং তাদের চাহিদা পূরণকারী বেসরকারি সংস্থাগুলোর জন্য সুযোগ তৈরি করতে সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে।
তিনি আরও বলেন, আমি জানি না আগামী ১৫ বছরের মধ্যে এমন কোনো আদর্শ পরিস্থিতিতে পৌঁছানো সম্ভব হবে কি না, যেখানে প্রত্যেকের প্রয়োজন মেটানো হবে। এমনটা ঘটবে বলে আমার সন্দেহ আছে, কিন্তু যদি তা না করা হয়, তবে অবৈধ অভিবাসন এবং অস্থিতিশীলতার দিক থেকে এর পরিণতি বেশ গুরুতর হবে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল নাগাদ বিশ্বজুড়ে ১১৭ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। বঙ্গা বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংস্থাগুলো নিজেরাই বিশ্বব্যাপী তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ শুরু করেছে, যার মধ্যে ভারতের রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ ও মাহিন্দ্রা গ্রুপ এবং নাইজেরিয়ার ডাঙ্গোটে অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার আলোচনায় দেখা গেছে, তারা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আরও বেশি এবং উন্নত মানের চাকরি তৈরিতে আগ্রহী। এর পাশাপাশি পানির বিষয়টিও একটি বড় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হবে। বিশ্বব্যাংক, অন্যান্য উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে আরও এক বিলিয়ন মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করার একটি উদ্যোগ ঘোষণা করতে চলেছে। এছাড়াও আফ্রিকায় ৩০ কোটি পরিবারকে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া এবং স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নের জন্য বিদ্যমান উদ্যোগগুলোও এতে যুক্ত হবে।
বাঙ্গা বলেন, গত শরতে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের বৈঠকে বিশ্বব্যাংক কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক ও ভৌত অবকাঠামোর ওপর মনোযোগ দিয়েছিল এবং এই শরতে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৈঠকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর জোর দিয়ে এই ধারা অব্যাহত রাখা হবে।
বিশ্বব্যাংক এমন পাঁচটি খাত চিহ্নিত করেছে যেগুলো বিনিয়োগ থেকে লাভবান হবে এবং যেগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্য বা উন্নত দেশগুলো থেকে আউটসোর্সিংয়ের ওপর নির্ভরশীল নয়। অবকাঠামো, ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য কৃষি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং মূল্য সংযোজিত উৎপাদন খাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রগতির ফলে এই খাতগুলো তাৎক্ষণিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তিনি আরও বলেন, সমস্যাটা হলো, আমরা এটা একা করতে পারব না। ৮০০ মিলিয়নের সেই আশ্চর্যজনক সংখ্যায় পৌঁছানোর জন্য আমাদের এই বরফের গোলাটিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে গড়িয়ে নামাতে হবে, আর গড়ানোর পথে এটি যেন প্রচুর বরফ সংগ্রহ করে।
সূত্র: রয়টার্স।