স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর বাড়িয়েছে জাতিসংঘ। এই সময়ে ব্যাংকিং খাত, রাজস্ব আদায় ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে সংস্কার করবে বাংলাদেশ। এ জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ধরে একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। তা উন্নয়ন সহযোগীদের, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কাছে জমা দিয়েছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইইউ ও জাতিসংঘ প্রতিবছর এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে।
গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর করা হয়। কোনো ভোটাভুটি বা আপত্তি ছাড়াই প্রস্তাবটি গৃহীত হয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ইইউ সময়সীমা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়েছে। তবে একই সঙ্গে কার্যকর সংস্কার পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে তারা।
সাধারণ পরিষদে ইইউর পক্ষে আয়ারল্যান্ড বলেছে, সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ‘ব্যতিক্রমী ও নির্দিষ্ট সময়সীমাভিত্তিক’ ব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে। এর সঙ্গে ‘দেশের অভ্যন্তরে সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য পদক্ষেপ, কার্যকর পর্যবেক্ষণ এবং অব্যাহত সম্পৃক্ততা’ থাকতে হবে।
সাধারণ পরিষদে ইইউর এক প্রতিনিধি বলেন, ‘নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণের পরও কোনো দেশ দীর্ঘ সময় ধরে এই শ্রেণিতে থেকে গেলে পুরো কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।’
প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর ক্ষেত্রে ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কোনো যৌক্তিক কারণ হতে পারে না’—জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির এই মতের সঙ্গেও একমত ইইউ। তবে সংস্থাটি বলেছে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনকে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি কোর গ্রুপের এক বৈঠকে অর্থমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। পরিকল্পনার প্রথম ধাপে পাঁচটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রতি মাসে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
২০২৬ থেকে ২০২৯ সাল মেয়াদি এই রূপরেখার লক্ষ্য হলো এলডিসি থেকে মসৃণ, টেকসই ও স্থায়ী উত্তরণ নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনমুখী ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করা। পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
রূপরেখায় প্রকৃত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালের ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে ৭ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সময়ে তিন বছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানের চার মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ থেকে বাড়িয়ে ছয় মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ করার লক্ষ্য ধরা হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানের ৭ শতাংশের নিচ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১০ শতাংশ এবং বিনিয়োগ-জিডিপি অনুপাত ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩২ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার ৩০ শতাংশের বেশি থেকে কমিয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
এ জন্য খেলাপি ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন কাঠামো তৈরি, ব্যাংকগুলোর নিয়মিত চাপ মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই (স্ট্রেস টেস্ট) এবং সম্পদের মান নিয়ে সমন্বিত পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে।
পাশাপাশি ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং একক ঋণগ্রহীতার ঋণসীমা কঠোরভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, অর্থনীতিতে শিল্প খাতের অবদান বাড়ানো এবং তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বছরভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
ব্যবসা সহজীকরণের সংস্কার কার্যক্রম তদারক করবে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সমন্বিত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস চালু, ১৪ দিনের মধ্যে ব্যবসা শুরুর লাইসেন্স দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় লাইসেন্স বাতিল এবং বিনিয়োগ-পরবর্তী সেবা নিশ্চিত করা।
নতুন উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় নথি ও সনদের সংখ্যা কমানো হবে। অনলাইনে কোম্পানি নিবন্ধনের ব্যবস্থাও চালু থাকবে।
এছাড়া দ্রুত মুনাফা দেশে ফেরত নেওয়ার বিধিমালা তৈরি, লাইসেন্সের মেয়াদ বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা এবং সব ধরনের অনুমোদন ও নবায়নের জন্য অভিন্ন ডিজিটাল আবেদন প্ল্যাটফর্ম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
কাস্টমস, বন্দর, বন্ডেড ওয়্যারহাউস, ব্যাংক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থার আওতায় আনা হবে। এর মাধ্যমে ৩৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে এই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। চলতি অর্থবছরের শেষ মাস জুনের মধ্যেই এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়নের লক্ষ্য রয়েছে।
বাণিজ্য সহজীকরণ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ২০২৮ সালের জুনের মধ্যে সমন্বিত শিল্প ও লজিস্টিকস করিডর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সময়ের মধ্যে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাণিজ্য সহজীকরণ চুক্তি বাস্তবায়ন এবং জাতীয় লজিস্টিকস নীতি ২০২৫ কার্যকর করা হবে।
বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় বিনিয়োগ, বাণিজ্যিক ও মেধাস্বত্বসংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ জন্য বিশেষায়িত বাণিজ্যিক আদালত ও মেধাস্বত্ব আদালত প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তি আধুনিকায়ন তহবিল গঠন, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রণোদনা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর কর্মসূচি রাখা হয়েছে।
জাতীয় উৎপাদনশীলতা মহাপরিকল্পনা (২০২১–২০৩০) হালনাগাদ করে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হবে। এতে নারী উদ্যোক্তাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানসহ মূলধারার বাইরে থাকা অন্যান্য উদ্যোক্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
দেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতের ওপর নির্ভরতা কমাতে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, চামড়া, পাট, হালকা প্রকৌশল, জাহাজ নির্মাণ ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মতো সম্ভাবনাময় খাতে নীতিসহায়তা ও প্রণোদনা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে রূপরেখায়।
রপ্তানিমুখী কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সময়সীমাভিত্তিক শিল্প জ্বালানি নিরাপত্তা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৯ সালের মধ্যে মোট জ্বালানি ব্যবহারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বন্দর ও পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নের পাশাপাশি বন্দরে কনটেইনার অবস্থানের সময় কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। বর্তমানে এই সময় ৯ দশমিক ৪৪ দিন। ২০২৯ সালের মধ্যে তা কমিয়ে তিন থেকে চার দিনে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বর্তমানের ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজস্ব আদায় বাড়াতে তিন বছর মেয়াদি বার্ষিক পরিকল্পনায় কর ব্যবস্থার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ১৬টি শ্রেণিতে নতুন করদাতাদের করজালে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
খেয়ালখুশিমতো নিরীক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান বাছাই বন্ধ করতে স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি (অটোমেটেড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) অথবা শুল্কায়ন-পরবর্তী নিরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষা কাঠামো চালু করা হবে।