মঙ্গলবার পর্যন্ত রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৩৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। এতে রংপুর বিভাগটি অ্যানথ্রাক্সের একটি নতুন ক্লাস্টার হয়ে উঠছে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাবের ঘটনা অনুসন্ধানে সেখানে একটি দল পাঠিয়েছে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
গত বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে রংপুরের কাউনিয়া, মিঠাপুকুর ও পীরগাছায় প্রায় ১০০ জন অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছেন। এ ঘটনায় অন্তত দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
আইইডিসিআরের সার্ভেইল্যান্স তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত সিরাজগঞ্জ, পাবনা, টাঙ্গাইল, রাজশাহী ও মেহেরপুরে অ্যানথ্রাক্সের প্রাদুর্ভাব বেশি। তবে গত বছর ও চলতি বছর রংপুরেও অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে। তাই রংপুর অ্যানথ্রাক্সের নতুন একটি ক্লাস্টার হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে আইইডিসিআর।
আইইডিসিআরের পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'উত্তরাঞ্চলে অ্যানথ্রাক্সের উপস্থিতি আগে থেকেই রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'তবে এখন সুন্দরগঞ্জে সংক্রমণের ঘটনা পাওয়া যাওয়ায় রংপুর একটি নতুন ক্লাস্টার হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে।'
জাকী জানিয়েছেন, সুন্দরগঞ্জে অ্যানথ্রাক্সের ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর আইইডিসিআরের একটি দল সেখানে পাঠানো হয়েছে। দলটি আক্রান্তের সংখ্যা, সংক্রমণের কারণ এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে।
রংপুরের সুন্দরগঞ্জের সর্বানন্দ ইউনিয়নে গত ১১ সেপ্টেম্বর স্থানীয়রা একটি অসুস্থ গরু জবাই করে মাংস ১০০ ভাগে ভাগ করে নেন। এর চার দিন পর গরু জবাই ও মাংস কাটায় অংশ নেওয়া চারজনের শরীরের বিভিন্ন অংশে জ্বর ও ফোসকা দেখা দেয়। এসব ফোসকা কারও পেটে, কারও হাতে, কারও পায়ে এবং কারও আঙুলে দেখা যায়।
এরপর থেকে ওই মাংস খাওয়া ৩৪ জন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
সুন্দরগঞ্জে গরু জবাইয়ের পর মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের বিষয়ে আইইডিসিআরের পরিচালক বলেন, আক্রান্ত প্রাণীর সংস্পর্শে এলে মানুষের অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে আক্রান্ত প্রাণী জবাই করা, এর মাংস বিক্রি করা কিংবা কাঁচা মাংস ও প্রাণীর অন্যান্য অংশ সরাসরি হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করার মাধ্যমে এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ডা. জাকী বলেন, অ্যানথ্রাক্স শুধু গবাদিপশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের আশপাশে থাকা প্রাণী ও বন্য প্রাণীর মধ্যেও এ রোগের জন্য দায়ী ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারে।
অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণে গবাদিপশুর নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করার গুরুত্বের ওপর জোর দেন তিনি। তার মতে, গরু, ছাগল, মহিষ, ভেড়া ও ঘোড়াসহ গৃহপালিত পশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা সরকারের পাশাপাশি পশুর মালিক ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
কোনো পশু অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বিবেচনা করে সেটি জবাই করে মাংস বিক্রি না করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। বরং নির্ধারিত নিয়ম মেনে পশুটিকে মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে।
তিনি বলেন, এমনভাবে পশুর মৃতদেহ পুঁতে ফেলতে হবে, যাতে শিয়াল, কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণী মাটি খুঁড়ে সেটি বের করে খেতে না পারে।
ডা. জাকী বলেন, এ বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নির্দেশনাগুলো যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু দীর্ঘ সময় মাটিতে টিকে থাকতে পারে। তাই কোনো এলাকায় এ জীবাণু থাকলেও গবাদিপশুকে নিয়মিত টিকা দেওয়া হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
রংপুরের পাশাপাশি চলতি বছরের আগস্টে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় ৩৮ জন অ্যানথ্রাক্স রোগী শনাক্ত হন। এর আগে দুই মাস আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে ১৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হন।
আইইডিসিআর জানিয়েছে, অ্যানথ্রাক্স প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়ানো একটি রোগ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ রোগটি দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে।
আগের অ্যানথ্রাক্স সংক্রমণের তথ্যের ভিত্তিতে ২০১৯ সালে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, মেহেরপুর, টাঙ্গাইল ও রাজশাহীর পাঁচ জেলার নয়টি উপজেলায় সক্রিয় অ্যানথ্রাক্স নজরদারি শুরু করে আইইডিসিআর।
২০২০ সালের পর থেকে অ্যানথ্রাক্সের প্রায় সব রোগী মেহেরপুর জেলায় শনাক্ত হয়েছেন। এ কারণে জেলার তিনটি উপজেলায় এখনো রোগটির নজরদারি কার্যক্রম চলছে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.