1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১৭ অপরাহ্ন

ইসলামী ব্যাংকে এস আলম আমলে নিয়োগ পাওয়া ৭৫ শতাংশই চট্টগ্রামের

Reporter Name
  • Update Time : বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ১১ Time View

ইসলামী ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে । এতে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই এই ব্যাংকে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুল সংখ্যক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ব্যাংকটিতে মোট যতজন কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে ৭৪ দশমিক ৭৭ শতাংশই (৮ হাজার ৯৯ জন) চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা।নিয়োগের ক্ষেত্রে এই আঞ্চলিক আধিপত্য সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে পটিয়া উপজেলায়। মোট নিয়োগের ৪৭ দশমিক ৫০ শতাংশ (৫ হাজার ১৪৮ জন) এবং চট্টগ্রাম থেকে হওয়া নিয়োগের ৬৩ দশমিক ৫৬ শতাংশই ছিল এই উপজেলার বাসিন্দা। উল্লেখ্য, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের বাড়ি পটিয়াতেই।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে এই অস্বাভাবিক আঞ্চলিকতার মূল কারণ হলো—কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করা। এতে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগ্য প্রার্থীরা আবেদনের সুযোগই পাননি।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি এখনো প্রতিবেদনটির বিষয়ে অবগত নন। তবে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে ইসলামী ব্যাংক ৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে। এর কারণ ছিল, নিয়োগে প্রশ্ন থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ৫ হাজার ৩৮৫ জন কর্মকর্তার জন্য একটি বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করেছিল, কিন্তু তারা সেই পরীক্ষায় অংশ নেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে চট্টগ্রামভিত্তিক এস আলম গ্রুপ জোরপূর্বক ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর কোনো ধরনের পরীক্ষা ছাড়াই এবং ভুয়া সনদপত্র ব্যবহারের মাধ্যমে এসব কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ শেষ হয়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়, যেখানে এস আলম গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আধিপত্য ছিল।

ব্যাংকটির মানবসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নতুন পর্ষদের করা অডিটে দেখা গেছে—২০১৭ সালে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকটি দখলে নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাংকটির মোট কর্মীর সংখ্যা ২১ হাজার।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বদলে ছিল সিভি সংগ্রহ বাক্স

পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের অফিসে 'সিভি সংগ্রহ বাক্স' রাখার মাধ্যমে প্রার্থী সংগ্রহ করা হতো।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাক্সগুলোতে আলাদা আলাদা ক্যাটাগরি বা শ্রেণিবিভাগ করা ছিল। যেমন—পটিয়া জেনারেল, পটিয়া ক্যাশ, পুরুষ জেনারেল/ক্যাশ, সাতকানিয়া-লোহাগাড়া, গণ্ডামারা-বাঁশখালী, হিন্দু জেনারেল, নারী ক্যাশ এবং পিয়ন/ডিপ্লোমা পদের জন্য আলাদা বক্স।

২০১৯ সালে কোনো পত্রিকা বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচে ১৭৮ জন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যা ব্যাংকের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিমালা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। একইভাবে, ২৩তম থেকে ২৬তম—এই চারটি ব্যাচের প্রবেশনারি কর্মকর্তাদের সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী নিয়োগের জন্য লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া, লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়া জরুরি ছিল। পাশাপাশি নিয়োগের অন্তত ১৫ দিন আগে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের বাধ্যবাধকতা ছিল। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এসব নিয়ম পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছে।

২০১৯ সালের মে মাসে ইসলামী ব্যাংক ১৭৮ জনকে নিয়োগপত্র দেয়। কিন্তু একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপির মাধ্যমে তাদের মধ্যে ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসলামী ব্যাংক কোনো জনশক্তি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নয়, তাই এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার তাদের নেই।

প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ব্যাংকের কয়েকজন উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)—যেমন মো. আকিজ উদ্দিন ও মিফতাহ উদ্দিন—নিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে পারেননি।

পূর্ববর্তী পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল, তা তাদের ছিল না। প্রতিবেদনে আরও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে যে ২০১৭ সালের পর ব্যাংকের নীতিমালায় আনা বিভিন্ন পরিবর্তন মূলত নির্দিষ্ট কিছু গোষ্ঠীকে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার জন্যই করা হয়েছিল।

মূল্যায়নে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে কর্মীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বর্তমান ব্যবস্থাপনার বৈষম্যমূলক আচরণের তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, একই ধরনের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আসা কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড প্রয়োগ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্তদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার আয়োজন করা হলেও, ১৭ জন কর্মকর্তাকে কোনো পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ না দিয়েই সরাসরি চাকরিচ্যুত করা হয়।

অন্যদিকে, আরও ২৪৩ জন কর্মকর্তা সেই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি, তবুও তাদের চাকরি বহাল রাখা হয়েছে।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এর কারণ হিসেবে বিদেশে পোস্টিং, অসুস্থতা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটির কথা উল্লেখ করলেও তদন্তে দেখা গেছে—অনেকে অব্যাহতি না চেয়েও চাকরিতে বহাল রয়েছেন, আবার অনেকে আবেদন করার পরও তাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ব্যাংকটির ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনটি সম্পর্কে অবগত নন।

তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের নিয়োগ বৈধ নাকি অবৈধ—শুধুমাত্র সেই ভিত্তিতে তাদের ছাঁটাই করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ‘তৎকালীন নিয়োগ প্রক্রিয়া ব্যাংকের চাকরির বিধিমালার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। তাই তাদের একটি পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।’

আলতাফ হোসেন দাবি করেন, তারা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেননি এবং অন্যদেরও পরীক্ষায় অংশ নিতে বাধা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ফলাফলস্বরূপ তাদের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে, কারণ তারা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকও জানিয়েছে, বিষয়টি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং এ ব্যাপারে প্রতিষ্ঠান নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’

ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসিম, যিনি ওই সময়ে মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন, তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, যারা সে সময় পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি, তাদের পরে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে দুটি আলাদা পক্ষ বিক্ষোভ করছে। একদিকে রয়েছেন চাকরি হারানো সাবেক কর্মীরা, যারা পুনরায় নিয়োগের দাবি জানাচ্ছেন।

অন্যদিকে, ‘ইসলামী ব্যাংক গ্রাহক সমন্বয় পরিষদ’ নামে আরেকটি পক্ষ এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের গ্রেপ্তার, লুট হওয়া সম্পদ উদ্ধার এবং বর্তমান পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়ে বিক্ষোভ করছে।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ