চীনের বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ১৩তম বেইজিং শিয়াংশান ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম। ১৫ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত এ ফোরামের চতুর্থ প্লেনারি অধিবেশনে ‘দ্য রোল অ্যান্ড ভিশন অব ডেভেলপিং কান্ট্রিস’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তব্য দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাতে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
বক্তব্যে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, সশস্ত্র সংঘাত, ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও জলবায়ুজনিত চাপের কারণে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিরাপত্তা, সমৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ জোরদার, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
দেশের পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক উন্নয়ন, অবকাঠামো, সামাজিক সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতিতে বাংলাদেশ অটল।
কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে পারস্পরিক সম্মান ও অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা, উন্নয়ন ও আস্থা তৈরির কাঠামো তৈরি করেছে। তবে কিছু অনিষ্পন্ন বিরোধ, সশস্ত্র ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সীমান্তবর্তী এলাকার অস্থিতিশীলতা টেকসই শান্তি ও উন্নয়নের পথে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
এক্ষেত্রে সংলাপ, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন, স্থানীয় চাহিদাভিত্তিক উন্নয়ন, আইনের শাসন এবং সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতির ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রসঙ্গে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি বছরের জুনে চীন সফর দুই দেশের ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক কো-অপারেটিভ পার্টনারশিপ’-এ নতুন গতি সঞ্চার করেছে। অবকাঠামো, যোগাযোগ, শিল্পায়ন, জ্বালানি, বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, সবুজ উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদ উন্নয়নে চীনের অবদানের কথাও তুলে ধরেন তিনি।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, এসব দেশ বৈশ্বিক নিরাপত্তা সিদ্ধান্তের শুধু অনুসারী নয়; আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো গঠনে তাদের অধিকার ও দায়িত্ব রয়েছে। এজন্য সংলাপ ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তি, জাতীয় সহনশীলতা এবং সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য তিনটি অগ্রাধিকার তুলে ধরা হয়।
এগুলো হলো- সংঘাতের আগেই প্রতিরোধমূলক কূটনীতি, আগাম সতর্কীকরণ ও আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনা জোরদার করা; সাইবার সহযোগিতা, উদীয়মান প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার, আন্তঃদেশীয় অপরাধ দমন, জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ প্রস্তুতির মাধ্যমে সম্মিলিত সহনশীলতা বৃদ্ধি করা; এবং সংঘাতপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপত্তার পাশাপাশি জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান, জীবিকা, শিক্ষা, অবকাঠামো ও স্থানীয় আস্থা জোরদার করা।
বক্তব্যের পর অনুষ্ঠিত উন্মুক্ত প্রশ্নোত্তর পর্বে আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপন করেন। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এসব প্রশ্নের উত্তর দেন।
বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক এ আন্তর্জাতিক ফোরামে বিভিন্ন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন।