কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি তৈরির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সমালোচনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, যেসব প্রতিষ্ঠান দ্রুত উন্নত এআই তৈরি করছে, তারাই আবার কেন এই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলছে।
ভ্যান্সের প্রশ্ন, কোনো প্রযুক্তি থেকে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করে, তাহলে সেই ঝুঁকি ঠেকানোর প্রযুক্তি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরিতে তারা নিজেরা আরো বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে না কেন। এএনআই নিউজ জানায়, জনপ্রিয় ব্যবসা ও প্রযুক্তিবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘অল-ইন পডকাস্ট’-এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এআই নিরাপত্তা নিয়ে চলমান বিতর্কের বিষয়ে কথা বলেন। ভ্যান্স বলেন, এআই খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এমন প্রযুক্তি তৈরি করে থাকে, যেটি ভবিষ্যতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে, তাহলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত সেই প্রযুক্তির উন্নয়ন থামানো। এরপর ওই প্রযুক্তির সম্ভাব্য ক্ষতি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত।
তিনি এ প্রসঙ্গে ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ চরিত্রের উদাহরণ দেন। ভ্যান্সের ভাষ্য, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি নিজেরাই এমন প্রযুক্তি তৈরি করে, যেটিকে পরে তারা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা করছে, তাহলে এর সমাধান হিসেবে সরকারের কাছে গিয়ে বিশ্বব্যাপী নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চাওয়া উচিত নয়। ভ্যান্স বলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের দায়িত্ব নেওয়া দরকার। তাদের তৈরি প্রযুক্তি যদি ঝুঁকি তৈরি করে, তাহলে সেই ঝুঁকি মোকাবিলার সরঞ্জামও তাদের তৈরি ও সরবরাহ করা উচিত।
আরো পড়ুন
এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই। তিনি এআই প্রযুক্তি তৈরির গতি কমানোর পক্ষে প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন। ভ্যান্স বলেন, আমোদেইকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে খুব ভালোভাবে চেনেন না। তবে গত কয়েক সপ্তাহে আমোদেইয়ের দেওয়া বক্তব্যগুলো তিনি পড়েছেন। তার পরিচিত কয়েকজনও আমোদেই সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলেছেন।
ভ্যান্সের মতে, আমোদেইয়ের উদ্বেগ আন্তরিক। তিনি মনে করেন, আমোদেই কোনো ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে এআই নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন না। বরং এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে তিনি সত্যিই উদ্বিগ্ন। তবে আমোদেইয়ের উদ্বেগের সঙ্গে একমত না হয়ে ভ্যান্স প্রশ্ন তোলেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি এআইয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে এতটাই চিন্তিত হয়, তাহলে ঝুঁকি মোকাবিলার ব্যবস্থা তৈরিতে তারা আরো বেশি উদ্যোগী হচ্ছে না কেন।
এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়েও কথা বলেন ভ্যান্স। তিনি বিশেষ করে সাইবার হামলার ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ঝুঁকির কথা তুলে ধরেন। ভ্যান্সের দাবি, অ্যানথ্রপিকের সর্বশেষ মডেল ব্যবহার করে সাইবার হামলার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে- এমন সরঞ্জাম তৈরি হচ্ছে। একই সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান এসব হামলা থেকে নিজেদের রক্ষা করতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে চায়। তার অভিযোগ, যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরনের সাইবার হামলা ঠেকাতে প্রযুক্তি ব্যবহার করতে চায়, তাদের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ সব সময় দেওয়া হচ্ছে না। ভ্যান্স বলেন, একদিকে এআই ব্যবহার করে আক্রমণের সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে সেই আক্রমণ ঠেকাতে চাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত প্রতিরোধমূলক প্রযুক্তি পাচ্ছে না। তার মতে, এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।
এআই নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের চেয়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজেদের দায়িত্ব নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন ভ্যান্স। তার বক্তব্য, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এমন শক্তিশালী এআই তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, তাহলে শুধু সরকারের কাছে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চাওয়া যথেষ্ট নয়। ভ্যান্সের মতে, প্রথমে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের প্রযুক্তি তৈরির গতি ও পদ্ধতি নিয়ে ভাবতে হবে। একই সঙ্গে এআইয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম তৈরি করতে হবে। তিনি আরো বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের তৈরি এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিরাপত্তা সরঞ্জাম তৈরি করে, তাহলে যেসব প্রতিষ্ঠান নিজেদের সুরক্ষার জন্য সেই সরঞ্জাম ব্যবহার করতে চায়, তাদের তা দেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।
এআই প্রযুক্তির নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিতর্কের বড় অংশ শুরু হয় অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেইয়ের প্রকাশ্য বক্তব্যের পর। তিনি এআই প্রযুক্তি তৈরির গতি কমানোর আহ্বান জানান। তার বক্তব্যের পর এআই খাতের অন্য শীর্ষ ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানান। তাদের মধ্যে ছিলেন ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান, মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা এবং গুগল ডিপমাইন্ডের প্রধান নির্বাহী ডেমিস হাসাবিস। এআইয়ের দ্রুত উন্নয়ন নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে অ্যানথ্রপিকের সঙ্গে যুক্ত গবেষক জ্যাকব কক্সনও প্রযুক্তি খাত ছাড়ার ঘোষণা দেন। কক্সনের বক্তব্য ছিল, অ্যানথ্রপিক ও এর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো এমন প্রযুক্তি তৈরির প্রতিযোগিতায় নেমেছে, যেগুলো ভবিষ্যতে তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই তিনি এআই খাত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। এআই প্রযুক্তির উন্নয়ন কতটা দ্রুত হওয়া উচিত এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় কী ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন—এসব প্রশ্ন এখন প্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।