'নেপো বেবি' শব্দটি হয়তো আধুনিক হলিউডের তৈরি একটি রূপক, তবে ভারতে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির স্বজন বা সন্তানদের বোঝাতে 'স্টার কিড' শব্দটি বহু আগে থেকেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এরা মূলত তারা, যাদের পরিবারের সূত্রে সিনেমা জগতে প্রবেশ করাটা কিছুটা সহজ হয়।
এই স্টার কিডদের অনেকেই পরবর্তীতে বেশ সফল ক্যারিয়ার গড়ে তুলেছেন, যার বড় অংশই ঘটেছে রেডিট বা টুইটারে 'নেপোটিজম' বা স্বজনপ্রীতি শব্দটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসার অনেক আগে। ভারতের প্রতিটি ভাষার চলচ্চিত্র শিল্পেই এমন সফল স্টার কিডদের উদাহরণ রয়েছে, তবে তাদের মধ্যে একজন নিজের বাবাকেও ছাপিয়ে গেছেন—তা-ও ক্যারিয়ারের একেবারেই শুরুর দিকে। ভারতের সবচেয়ে সফল স্টার কিড ১৯২০-এর দশকে পৃথ্বীরাজ কাপুর লাহোরে নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে তার অভিনয় জীবন শুরু করেন। ১৯২৮ সালে বোম্বেতে স্থানান্তরিত হওয়ার পর তিনি চলচ্চিত্র অভিনয়ে যুক্ত হন। ত্রিশের দশকের মধ্যে পৃথ্বীরাজ হিন্দুস্তানি সিনেমার অন্যতম শীর্ষ অভিনেতা হিসেবে বিবেচিত হতে থাকেন। তার ছোট ভাই ত্রিলোক কাপুর ১৯৩৩ সালে 'চার দরবেশ' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে এই পেশায় তার সাথে যোগ দেন। আর এভাবেই সূচনা হয় কাপুর পরিবারের—যে বংশধারা আজ অবধি বলিউড অভিনেতা তৈরি করে চলেছে।
এ পরিবারের প্রথম 'স্টার কিড' চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন যখন পৃথ্বীরাজের জ্যেষ্ঠ পুত্র রাজ কাপুর ১৯৩৫ সালে 'ইনকিলাব' ছবিতে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন। তবে প্রধান চরিত্রে অভিনেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার জন্য তাকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে 'নীল কমল' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার সাফল্য আসে।
তবে ১৯৪৯ সালে তার করা কাজগুলোই তাকে তারকাখ্যাতির শীর্ষে নিয়ে যায়। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই রাজ কাপুর 'আন্দাজ' এবং 'বারসাত'—পরপর দুটি ব্যবসা সফল সিনেমা উপহার দেন। এর মধ্যে 'বারসাত' ছবিটি তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে বেশি আয় করা সিনেমা হিসেবে স্থান করে নেয় এবং ২ কোটি রুপি আয় করে 'কিসমাত' ছবির রেকর্ড ভেঙে ফেলে। এই সাফল্য রাজ কাপুরকে দিলীপ কুমার এবং দেব আনন্দের সাথে একত্রে বলিউডের শীর্ষ তিন নায়কের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে। এই ত্রয়ী ১৯৫০ এবং ৬০-এর দশকে হিন্দি সিনেমায় আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। রাজ কাপুরের ২০০০ কোটি রুপির সিনেমা 'বারসাত' ছবির সাফল্য যদি বিস্ময়কর হয়ে থাকে, তবে রাজ কাপুরের ঝুলিতে আরও চমক বাকি ছিল। ১৯৫১ সালে তিনি 'আওয়ারা' চলচ্চিত্রে অভিনয় এবং এটি পরিচালনা করেন, যা সমাজতান্ত্রিক ও সংস্কারবাদী ভাবধারায় নির্মিত হয়েছিল। ২৭ বছর বয়সে এটি পরিচালক হিসেবে তার তৃতীয় এবং তর্কাতীতভাবে সবচেয়ে সফল সিনেমা ছিল। 'আওয়ারা' সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্লকবাস্টার হিসেবে ভারত এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন—উভয় দেশেই পূর্ণ প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়। বিশ্বজুড়ে এটি ১৫ কোটি টাকারও বেশি আয় করে। মুদ্রাস্ফীতি বিবেচনায় নিলে, বর্তমান সময়ে এর মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২০০০ কোটি রুপি, যা 'আওয়ারা'কে আজ পর্যন্ত হিন্দি সিনেমার অন্যতম সফল একটি চলচ্চিত্রে পরিণত করেছে। এই চলচ্চিত্রের সাফল্য রাজ কাপুরকে রাশিয়ার এক বিশাল তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করে এবং পরবর্তীতে তার সমস্ত সিনেমা সেখানে হিট হয়।
তার কর্মজীবন জুড়ে রাজ কাপুর বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচকদের প্রশংসাও কুড়িয়েছেন। 'আওয়ারা' কান চলচ্চিত্র উৎসবে শীর্ষ পুরস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। চার বছর পর, 'বুট পলিশ' ছবিটিকেও এই উৎসবে সংবর্ধিত করা হয় এবং এটিও পামে ডি'ওর জয়ের দৌড়ে ছিল। এছাড়া 'জাগতে রাহো' (১৯৫৬) কার্লোভি ভ্যারি আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ক্রিস্টাল গ্লোব পুরস্কার জয় করে। অন্যান্য 'স্টার কিড'দের থেকে যেভাবে রাজ কাপুর অনন্য উচ্চতায় বছরের পর বছর ধরে রাজ কাপুরের নিজস্ব পুত্র ঋষি কাপুর, ভাই শশী কাপুর ও শাম্মী কাপুর এবং নাতি রণবীর কাপুরসহ একাধিক 'স্টার কিড' সফল কর্মজীবন গড়ে তুলেছেন।
সালমান খান এবং আমির খানও চলচ্চিত্র পরিবারের সন্তান। নারীদের মধ্যে নূতন এবং কাজল নিজ নিজ সময়ে শীর্ষ তারকা ছিলেন। বলিউডের বাইরে নাগার্জুন, আল্লু আর্জুন, প্রভাষ, জুনিয়র এনটিআর, নন্দমুরি বালকৃষ্ণ, পৃথ্বীরাজ সুকুমারান এবং শিব রাজকুমার—তারা সবাই কোনো না কোনো সময় স্ব স্ব ইন্ডাস্ট্রির শীর্ষে অবস্থান করেছেন। রাজ কাপুরকে যে বিষয়টি তাদের চেয়ে আলাদা ও অনন্য করে তুলেছে, তা শুধু অভিনেতা হিসেবে তার সাফল্য নয়, বরং একজন পরিচালক-প্রযোজক হিসেবে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব।
অভিনেতা হিসেবে তিনি ৬৩টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, যার মধ্যে ১৭টি হিট—এদের মধ্যে ৫টি ব্লকবাস্টার এবং ২টি সর্বকালের সেরা ব্লকবাস্টার। পর পর দুটি সর্বোচ্চ আয়কারী ভারতীয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করা একমাত্র অভিনেতা তিনিই। তার 'আওয়ারা' এবং 'জাগতে রাহো'-র মতো চলচ্চিত্রগুলো ভারতীয় সিনেমার জন্য একটি নতুন বাজার—রাশিয়া উন্মুক্ত করেছিল এবং বিদেশে বক্স অফিস আয়ের যে প্রবণতা, তা শুরু করেছিল।
পরিচালক হিসেবে তার সাফল্যের হার ছিল প্রায় শতভাগ, তার পরিচালিত ১০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৮টিই বক্স অফিসে সাফল্য পায়। 'সংগম' চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বিদেশে শুটিং করেন। 'মেরা নাম জোকার'-এ তিনি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক অভিনয়শিল্পী দলকে (কাস্ট) তুলে ধরেন। এ ছাড়া তিনি নিমি, ঋষি কাপুর, ডিম্পল কাপাডিয়া এবং জিনাত আমানের মতো অভিনয়শিল্পীদের ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়ে আসেন। তবে ভারতীয় সিনেমায় তার সম্ভবত সবচেয়ে বড় অবদান হলো সমাজকেন্দ্রিক থিমের সাথে ব্লকবাস্টার সিনেমার মেলবন্ধন ঘটানো, যা তিনি 'আওয়ারা' থেকে শুরু করে 'রাম তেরি গঙ্গা ময়লী' পর্যন্ত বারবার করে দেখিয়েছেন।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.