দেশের হোটেল খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি দেখছেন রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. আল আমিন।
তার মতে, সরকার ও বেসরকারি খাত মিলে একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা গেলে দেশের আতিথেয়তা খাতকে এশিয়ার অন্যান্য দেশের সমপর্যায়ে, এমনকি তাদের চেয়ে এগিয়ে নেওয়াও সম্ভব।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রণোদনা ও দক্ষ জনবল তৈরিতে মনোযোগ দিতে বলেছেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন— চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস অনুষ্ঠানে এসব অভিমত তুলে ধরেন আল আমিন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়।
এতে ঢাকার হোটেল ব্যবসার পরিবর্তন, বিদেশি অতিথিদের চাহিদা, বাংলাদেশের খাবারের বৈশ্বিক সম্ভাবনা, আতিথেয়তা খাতের জনবল, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেন তিনি।
মো. আল আমিনের চোখে, গত এক দশকে ঢাকার হোটেল ব্যবসায় বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে গেছে।
তিনি বলেন, “ফিডার মার্কেটে (যে দেশ থেকে অতিথি বা গ্রাহক আসেন) পরিবর্তন এসেছে। গ্রাহকদের সেবা নেওয়ার আচরণ বদলে গেছে।
“২০১০ সালের পর ঢাকা মূলত ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের গন্তব্য ছিল। অবকাশযাপনকারী পর্যটক টানা খুব একটা সম্ভব হয়নি। যারা ব্যবসার কাজে বাংলাদেশে আসতেন, তারাই মূলত ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে উঠতেন।”
কিন্তু গত ১০ বছরে গ্রাহকদের ব্যয় করার সক্ষমতা বেড়েছে, ফলে পাঁচ তারকা হোটেলে গ্রাহকগোষ্ঠীর পরিধি বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
এ পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক ভূরাজনীতি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
তিনি বলেন, “গ্রাহকদের জীবনযাপনের ধরনও বদলেছে। তারা নিজেদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করছেন। এর প্রভাব পড়েছে হোটেল ও আতিথেয়তা খাতেও।
আগামী ১০ বছরে এ খাতে আরও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন মো. আল আমিন।
"গত ১০ বছরে অবশ্যই প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে কিছু সমস্যা ছিল, যেগুলো প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। এখন আমি খুবই আশাবাদী যে আগামী ১০ বছরে আমাদের আতিথেয়তা খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”
জুলাই অভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এরপর ক্ষমতায় আসে মুহম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। এর দেড় বছরের মাথায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় বসে বিএনপি।
দেড় বছরের এই রাজনৈতিক ডামাডোলের প্রভাব দেশের হোটেল খাতেও পড়েছে বলে মনে করেন আল আমিন।
তিনি বলেন, বিদেশি পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের ওপর নির্ভরশীল হোটেলগুলো এ সময়ে বেশি চাপে ছিল।
নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন দেশের ভ্রমণ সতর্কতা জারির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, "কোনো দেশে যাওয়ার আগে সবাই প্রথমে নিরাপত্তা ও সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনা করে। বাংলাদেশ নিয়েও অনেক দেশ ভ্রমণ সতর্কতা জারি করেছিল। এখন হয়তো কিছু দেশের ক্ষেত্রে তা শিথিল হয়েছে। তবে বেশির ভাগ দেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হয়নি।”
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় হোটেলগুলোকে চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতার মধ্যে পড়তে হয় বলে মনে করেন মো. আল আমিন।
তিনি বলেন, চাহিদা কম থাকায় হোটেলগুলোকে প্রতিযোগিতামূলক দামে কক্ষ ও সেবা দিতে হয়েছে। এতে এক ধরনের মূল্যযুদ্ধ তৈরি হয়, যা শিল্পের জন্য স্বাস্থ্যকর নয়।
মো. আল আমিনের মতে, পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যবসার কৌশলেও পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানের পাঁচ তারকা হোটেলের গ্রাহকেরা আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন বলে মনে করেন তিনি।
বিশেষ করে খাদ্য ও পানীয়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকরা বেশ সচেতন। কারণ বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের কারণে তারা খাবার ও সেবার মান সম্পর্কে বেশি ধারণা রাখেন।
"তারা আমাদের টাকা দেন এবং সেবা চান। সেখানে কোনো আপস তারা চান না।”
তার মতে, পাঁচ তারকা হোটেলের মূল প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত নিখুঁত সেবা।
কোনো ভুল হলে অতিরিক্ত সুবিধা দিয়ে তা পুষিয়ে দেওয়ার চেয়ে ভুল না করার ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশি খাবার সুস্বাদু ও বৈচিত্র্যময় হলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তা যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে মনে করেন মো. আল আমিন।
তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলো নিজেদের খাবারকে বিশ্ববাজারে যেভাবে তুলে ধরেছে, বাংলাদেশ তা পারেনি।
এর অন্যতম কারণ হিসেবে পর্যাপ্ত গবেষণা না হওয়ার কথা বলেন তিনি।
নতুন প্রজন্মের অনেক গ্রাহক এখন স্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী খাবারকেও নতুনভাবে উপস্থাপনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।