এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখতে এফটিএ ও সেপা চুক্তি দ্রুত সম্পন্নের তাগিদ দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে এসব চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই বৈঠকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) কার্ড বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ, ভুয়া কার্ডধারীদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতিযোগিতা কমিশনকে কার্যকর করা, বিদেশে অদক্ষ বাণিজ্যিক মিশনের কর্মকর্তাদের প্রত্যাহার এবং তৈরি পোশাক খাতের সুতা-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. খালেদ হোসেন মাহবুব এমপির সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এসব সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, কমিটির সদস্য বরকত উল্লাহ বুলু, আবুল হোসেন খান, আবুল কালাম, হেলেন জেরিন খান, হামিদুর রহমান, মোহাম্মাদ কামাল হোসেন, গাজী এনামুল হক, আব্দুল মুনতাকিমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এলডিসি উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সুরক্ষায় এফটিএ
বৈঠকে জানানো হয়, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি ও রূপান্তরকাল ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ইনবিট মেকানিজম’ বা জিএসপি বিধির আওতায় বাংলাদেশ ২০৩২ সাল পর্যন্ত শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা পাবে। তবে এই সুবিধার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখতে এখন থেকেই বিকল্প বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা জরুরি।
এ লক্ষ্যে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নিউজিল্যান্ড, ওমান, হংকং, অস্ট্রেলিয়া ও আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার তাগিদ দিয়েছে কমিটি। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাজারের সঙ্গেও এফটিএ ও সেপা চুক্তির উদ্যোগ জোরদারের সুপারিশ করা হয়।
বৈঠকে টিসিবির কার্ড বিতরণ ও ডিলার নিয়োগে বিগত সরকারের সময়ে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি এবং ভুয়া কার্ড বিতরণের অভিযোগ উঠে আসে। প্রকৃত নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পৌঁছে দিতে ভুয়া কার্ডধারীদের শনাক্ত করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য টিসিবিকে দ্রুত বিশেষ কর্মসূচি বা ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ চালুর সুপারিশ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক, দলীয় কিংবা ব্যক্তিগত সুপারিশ সম্পূর্ণ বন্ধ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে সততা, যোগ্যতা ও নির্ধারিত মানদণ্ডকে প্রাধান্য দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে কমিটি।
বাজারে সিন্ডিকেট ও একচেটিয়া ব্যবসায়িক কারসাজি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের কার্যকারিতা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। কমিটির সদস্যরা মনে করেন, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের করা রিটের কারণে অনেক মামলার কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। এতে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে কমিশনের প্যানেল আইনজীবীর সংখ্যা বাড়ানো এবং আপিল বা রিটের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ জামানত বা জরিমানা হিসেবে জমা রাখার বিধান চালুর জন্য আইনি সংস্কারের সুপারিশ করা হয়েছে।
সুগন্ধি চাল রপ্তানিতে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ
দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলে উৎপাদিত সুগন্ধি চালের আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা থাকলেও রপ্তানিকারকদের সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেস-টু-কেস ভিত্তিতে ঋণপত্র (এলসি) যাচাই করে অভিজ্ঞ মিলারদের সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে রপ্তানি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা আনা এবং কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চা শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি চা-বাগান এলাকায় সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত রাখার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগকে সুপারিশ করা হয়েছে।
অদক্ষ বাণিজ্যিক মিশন প্রত্যাহারের তাগিদ
বিদেশে বাংলাদেশের ২৪টি বাণিজ্যিক মিশনের কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা কঠোরভাবে মূল্যায়নের তাগিদ দিয়েছে কমিটি। যেসব কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট দেশের ভাষা জানেন না কিংবা বাংলাদেশের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না, তাদের প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। বাণিজ্যিক মিশনগুলোর কার্যক্রম আরো ফলপ্রসূ করতে কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও পারফরম্যান্সকে মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
পোশাক খাতের সুতা-সংকট নিরসনে সমীক্ষা
তৈরি পোশাক খাতের সিঙ্গেল টোয়েন্টি ও সিঙ্গেল থার্টি কাউন্ট সুতার জটিলতা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। এ সমস্যার কারণে পোশাকশিল্পে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনকে (বিটিটিসি) পূর্ণাঙ্গ প্রভাব বিশ্লেষণ প্রতিবেদন তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়।