কখনো অবিশ্বাস্য সব পাস, ড্রিবলিং আর গোলের জাদুতে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন লিওনেল মেসি। কখনো গোলের পর গোল করে প্রতিপক্ষকে অসহায় করে তুলেছেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। আর পায়ের কারুকাজে নেইমার যেন মাঠে ফুটবল নয়, শিল্পের প্রদর্শনীই করেছেন। তিনজনের খেলার ধরন আলাদা, দেশও ভিন্ন। কিন্তু ফুটবল বিশ্বকে প্রায় দুই দশক মাতিয়ে রেখেছিলেন একইভাবে। সেই তিন মহাতারকার আন্তর্জাতিক ফুটবল অধ্যায়েরও সমাপ্তি ঘটেছে। রোনালদোর বিদায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পর্দা নামল ফুটবলের এক সোনালি যুগের।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন রোনালদো। এর আগে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচ খেলেছেন মেসি, ব্রাজিলকে বিদায় জানিয়েছেন নেইমারও। ফলে জাতীয় দলের জার্সিতে এই তিন মহাতারকার দ্বৈরথ দেখার সুযোগ আর থাকছে না ফুটবলপ্রেমীদের। তবে তাদের রেখে যাওয়া রেকর্ডগুলোই বলে দিচ্ছে, কতটা অবিশ্বাস্য ছিল এই তিন কিংবদন্তির পথচলা।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনজন মিলে খেলেছেন ৫৭২ ম্যাচ। গোল করেছেন ৩৫২টি, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১৭৩টি। হ্যাটট্রিক করেছেন ২৫ বার। সংখ্যাগুলো যেমন বিস্ময়কর, তেমনি তাদের অর্জনের গল্পও।
১৮ বছর বয়সে শুরু, তিনজনের পথচলা দুই দশকজুড়ে
তিন মহাতারকার আন্তর্জাতিক ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল একই বয়সে। প্রত্যেকেই জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তুলেছিলেন মাত্র ১৮ বছর বয়সে। তবে সবার আগে যাত্রা শুরু করেছিলেন রোনালদো। ২০০৩ সালের ২০ আগস্ট পর্তুগালের হয়ে অভিষেক হয় তার। ঠিক দুই বছর পর, ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম মাঠে নামেন মেসি। আর নেইমারের ব্রাজিল অধ্যায় শুরু হয় ২০১০ সালের ১০ আগস্ট।
এরপর দীর্ঘ পথচলায় সবচেয়ে বেশি সময় আন্তর্জাতিক ফুটবলে কাটিয়েছেন রোনালদো। ২৩ বছরের বেশি সময়ে পর্তুগালের হয়ে খেলেছেন ২৩৪ ম্যাচ। মাঠে ছিলেন ১৮ হাজার ৬০০ মিনিটের বেশি। ৪১ বছর বয়সে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ওয়েলসের বিপক্ষে খেলেছেন জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচটি। বিদায়ের সময় পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার বিশ্বরেকর্ডও তার দখলে।
মেসির পথচলাও কম দীর্ঘ নয়। ২১ বছরের বেশি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছেন ২০৮ ম্যাচ। মাঠে কাটিয়েছেন ১৭ হাজার ২০০ মিনিটের বেশি। ৩৯ বছর বয়সে গত ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের ইতি টানেন তিনি।
অন্যদিকে ১৫ বছরের বেশি সময়ে ব্রাজিলের হয়ে নেইমার খেলেছেন ১৩০ ম্যাচ। মাঠে কাটিয়েছেন ১০ হাজার ৬০০ মিনিটের বেশি। ৩৪ বছর বয়সে গত ৫ জুলাই নরওয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচটিই হয়ে থাকে জাতীয় দলের হয়ে তার শেষ ম্যাচ।
গোলের রাজা রোনালদো, সৃষ্টিশীলতায় এগিয়ে মেসি
আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলের পরিসংখ্যানে বাকি দুজনের চেয়ে এগিয়ে রোনালদো। পর্তুগালের জার্সিতে ২৩৪ ম্যাচে তার গোল ১৪৬টি। এটি পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলের বিশ্বরেকর্ড। গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৪৫টি গোল।
এক পঞ্জিকাবর্ষে রোনালদোর সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ২০১৯ সালে। সেবার ১৪ গোল করেছিলেন তিনি। এক ম্যাচে সর্বোচ্চ চার গোল করেছেন দুবার। ২০১৬ সালে অ্যান্ডোরার বিপক্ষে ৬-০ গোলের জয়ে এবং ২০১৯ সালে লিথুয়ানিয়ার বিপক্ষে ৫-১ গোলের জয়ে। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সব মিলিয়ে তার হ্যাটট্রিক ১০টি।
গোলের হিসাবে রোনালদোর কিছুটা পেছনে থাকলেও সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরিতে এগিয়ে মেসি। আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোলের পাশাপাশি ৬৯টি গোলে সহায়তা করেছেন তিনি।
মেসির জন্য সবচেয়ে সফল বছর ছিল ২০২২ সাল। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর সেই বছরেই জাতীয় দলের হয়ে ১৮ গোল করেন তিনি। এক ম্যাচে তার সর্বোচ্চ গোল পাঁচটি। এস্তোনিয়ার বিপক্ষে ৫-০ গোলের প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনার সব কটি গোলই করেছিলেন এই মহাতারকা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার হ্যাটট্রিক ১১টি, যা রোনালদোর চেয়েও একটি বেশি।
অন্যদিকে নেইমার ব্রাজিলের হয়ে ১৩০ ম্যাচে করেছেন ৮০ গোল। সঙ্গে ৫৯টি গোলে সহায়তা রয়েছে তার নামে। কিংবদন্তি পেলেকে ছাড়িয়ে ব্রাজিলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনটিও দখল করেছেন তিনি।
নেইমারের সবচেয়ে বেশি গোল এসেছিল ২০১৪ সালে। সেবার জাতীয় দলের হয়ে ১৫ গোল করেন এই ফরোয়ার্ড। জাপানের বিপক্ষে ৪-০ গোলের জয়ে একাই চার গোল করেছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে চারটি হ্যাটট্রিকও রয়েছে তার।
শিরোপায় মেসির বিশ্বকাপ, রোনালদোর ইউরো জয়
ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যেও নিজেদের আলাদা উচ্চতায় নিয়ে গেছেন এই তিন মহাতারকা। তবে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত শিরোপাটি জিতেছেন মেসিই।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২১ সালে আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকার শিরোপা এনে দেন মেসি। পরের বছর ইতালিকে হারিয়ে জেতেন ফিনালিসিমা। এরপর ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ জিতে পূর্ণতা দেন নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারকে। ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতেন তিনি। সব মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে চারটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা রয়েছে মেসির।
রোনালদোর অর্জনও কম নয়। ২০১৬ সালে পর্তুগালকে প্রথম ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ জেতানোর পর ২০১৮-১৯ মৌসুমে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপা জেতেন। ২০২৪-২৫ মৌসুমে আবারও একই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় পর্তুগাল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তিনটি বড় শিরোপা জিতে বিদায় নিয়েছেন তিনি।
তবে দলীয় সাফল্যে কিছুটা পিছিয়ে নেইমার। ব্রাজিলের হয়ে তার একমাত্র বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক শিরোপা ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশনস কাপ। বিশ্বকাপ কিংবা কোপা আমেরিকা জয়ের স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত অপূর্ণই থেকে গেছে তার।
শুধু খেলোয়াড় হিসেবে নয়, নেতৃত্বেও বড় ভূমিকা রেখেছেন তিনজন। পর্তুগালের অধিনায়ক হিসেবে রোনালদো মাঠে নেমেছেন ১৭২ ম্যাচে। আর্জেন্টিনাকে ১৪৮ ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন মেসি। আর ব্রাজিলের অধিনায়ক হিসেবে নেইমার খেলেছেন ২১ ম্যাচ।
ব্যালন ডি'অরের লড়াইয়ে মেসি-রোনালদোর একচ্ছত্র আধিপত্য
ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি'অরের ইতিহাসেও মেসি ও রোনালদোর আধিপত্য ছিল অবিশ্বাস্য। বছরের পর বছর এই দুই মহাতারকার মধ্যেই চলেছে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই।
রেকর্ড আটবার ব্যালন ডি'অর জিতেছেন মেসি। তার পুরস্কারগুলো এসেছে ২০০৯, ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫, ২০১৯, ২০২১ ও ২০২৩ সালে। সব মিলিয়ে ১৭ বার মনোনয়ন পেয়েছেন তিনি, যার মধ্যে ১৪ বারই ছিলেন সেরা তিনে।
অন্যদিকে রোনালদো পাঁচবার জিতেছেন ব্যালন ডি'অর। ২০০৮ সালে প্রথমবার পুরস্কারটি জেতার পর ২০১৩, ২০১৪, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে আবারও শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পান তিনি। ২০০৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে টানা ১৮ বার মনোনয়ন পেয়েছিলেন পর্তুগিজ তারকা। এর মধ্যে ১২ বার জায়গা করে নেন সেরা তিনে।
নেইমার অবশ্য কখনোই ব্যালন ডি'অর জিততে পারেননি। নয়বার মনোনয়ন পেলেও সর্বোচ্চ অর্জন ছিল তৃতীয় স্থান। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে দুবার এই অবস্থানে থেকে পুরস্কারের মঞ্চ ছাড়তে হয়েছিল ব্রাজিলিয়ান তারকাকে।
তিন কিংবদন্তির অবিশ্বাস্য সব সংখ্যা
তিনজনের সম্মিলিত পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক ফুটবলে কী অসাধারণ এক প্রজন্মের সাক্ষী ছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। সব মিলিয়ে জাতীয় দলের হয়ে ৪৬ হাজার ৪০০ মিনিটের বেশি মাঠে কাটিয়েছেন তারা। ২৫টি হ্যাটট্রিকের পাশাপাশি ৩৪১ ম্যাচে অধিনায়কত্ব করেছেন। জিতেছেন আটটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা।
ব্যক্তিগত অর্জনেও সংখ্যাগুলো চোখধাঁধানো। তিনজন মিলে ব্যালন ডি'অরের মনোনয়ন পেয়েছেন ৪৪ বার। সেরা তিনে জায়গা করে নিয়েছেন ২৮ বার। আর পুরস্কার জিতেছেন মোট ১৩ বার।
ক্লাব ফুটবলে তাদের গল্প এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেসি, রোনালদো ও নেইমারের অধ্যায় শেষ। তিনজনকে নিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের বিতর্ক হয়তো চলবে আরও বহু বছর।