ব্যবসায়ী নেতা ও অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নতুন বাজারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এই চুক্তির কারণে বাড়তি কমপ্লায়েন্স বা বিধিবিধান পরিপালন এবং সরবরাহব্যবস্থায় নতুন শর্ত পূরণের চাপ তৈরি হতে পারে। তাই চুক্তির বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা চান তারা।
ঢাকায় আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) ও যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস যৌথভাবে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ৩০তম ইউএস ট্রেড শো ২০২৬-এর শেষ দিন আজ শনিবার 'বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ' শীর্ষক এক সেমিনারে তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ফুটওয়্যার, লেদার গুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, চুক্তির বিভিন্ন ধারা, সম্ভাব্য সুফল এবং এর সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিগুলো নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, চুক্তির সুযোগ কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে প্রথমে রপ্তানিকারকদের বুঝতে হবে, এর প্রভাব কী হতে পারে।
'চুক্তিটি কীভাবে কাজে লাগানো হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তিতে কী আছে এবং এর অর্থ কী—এসব বিষয়ে পূর্ণ স্বচ্ছতা থাকা প্রয়োজন', বলেন তিনি।
নাসিম মঞ্জুর সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি বাংলাদেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারের কাছেও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। পরবর্তী সময়ে তারাও বাংলাদেশের কাছ থেকে একই ধরনের বাজারসুবিধা চাইতে পারে।
তিনি বলেন, চুক্তিটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বড় চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে পারে এবং বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার সুযোগ করে দিতে পারে। তবে কমপ্লায়েন্সের উচ্চতর মানদণ্ড পূরণ এবং সরবরাহব্যবস্থার প্রতিটি ধাপের তথ্য শনাক্ত ও অনুসরণযোগ্য রাখার শর্ত ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। এ জন্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আগেভাগেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ককাঠামো পর্যালোচনা করে পণ্যের বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এনে কীভাবে শুল্ক কমানো যায়, তা খতিয়ে দেখারও আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি বিশেষায়িত আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়ীদের পণ্যে কী ধরনের পরিবর্তন আনলে প্রযোজ্য শুল্কের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব, তা চিহ্নিত করতে সহায়তা করে।
সেমিনারে চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয়ে নীতিনির্ধারক ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে সীমিত যোগাযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
শাশা ডেনিমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ বলেন, চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এটি থেকে কীভাবে সুফল পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে ব্যবসায়ীরা তেমন কোনো দিকনির্দেশনা পাননি। তিনি অভিযোগ করেন, চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি মন্ত্রণালয়গুলো রপ্তানিকারকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করেনি।
তবে তার মতে, চুক্তিটি ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করছে। আগে যারা বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহ করত না, এমন কিছু প্রতিষ্ঠানও এখন এ দেশে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছে।
শামস মাহমুদ যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে নতুন করে পণ্য সংগ্রহের সুযোগ তৈরির বিষয়টিও তুলে ধরেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করে তা দিয়ে কাপড় তৈরি করছে। এরপর সেই কাপড় দিয়ে তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি করছে। বাংলাদেশের সরবরাহকারীদের জন্যও এ ধরনের বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কটন ইউএসএর কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ আলী আরসালান বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিমন্ত্রী ব্রুক রোলিন্স সম্প্রতি 'গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান'-এর আওতায় বাংলাদেশের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, এ উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহারের ভিত্তিতে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে পূর্ণ শুল্কমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। তবে কী প্রক্রিয়ায় এই সুবিধা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ—এ দুটিকে পরস্পরের পরিপূরক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি বলেন, চুক্তির সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশকে কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থা জোরদার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও এসব সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.