1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০১:২৭ অপরাহ্ন

বিনোদিনী দাসী: রঙ্গমঞ্চের আলোয়, জীবনের অন্ধকারে

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ২৮ Time View

পল্লবী বড়ুয়া | শনিবার , ৭ নভেম্বর, ২০২৬ at ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ

ঊনিশ শতকের কলকাতায় যখন নারীর প্রকাশ্য উপস্থিতিই ছিল সামাজিক বিতর্কের বিষয়, তখন এক কিশোরী মঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছেন। দর্শক তাঁর অভিনয়ে মুগ্ধ হচ্ছেন, প্রশংসা করছেন। অথচ মঞ্চের বাইরে সেই অভিনেত্রীর সামাজিক পরিচয় সম্মানের নয়। শিল্পী হিসেবে তাঁর প্রতিভা স্বীকৃতি পাচ্ছে, কিন্তু মানুষ হিসেবে তাঁর মর্যাদা বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠেছিল বিনোদিনী দাসীর (১৮৬৩১৯৪১) জীবন। বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে তিনি একজন অসাধারণ অভিনেত্রী। কিন্তু তাঁর গুরুত্ব শুধু অভিনয় প্রতিভায় সীমাবদ্ধ নয়। আমার কথা (১৯১২) এবং পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত অসমাপ্ত আত্মস্মৃতিমূলক রচনা আমার অভিনেত্রী জীবন–এ নিজের অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করে তিনি ঊনিশ শতকের নাট্যজগৎ ও সমাজের এমন এক ইতিহাস রেখে গেছেন, যা প্রতিষ্ঠিত পুরুষ নাট্যকার, পরিচালক কিংবা নাট্যসংগঠকদের বিবরণে সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না।

কলকাতার দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া বিনোদিনীর শৈশব ছিল অনিশ্চয়তায় ভরা। অল্প বয়সেই জীবিকার প্রয়োজন তাঁকে রঙ্গমঞ্চের দিকে নিয়ে যায়। ১৮৭৪ সালে গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটারে তাঁর অভিনয়জীবন শুরু। তখন বাংলা পেশাদার থিয়েটার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। দীর্ঘদিন নারী চরিত্রে পুরুষের অভিনয়ের প্রচলন থাকলেও ধীরে ধীরে মঞ্চে নারী অভিনেত্রীদের উপস্থিতি বাড়ছিল। কিন্তু অভিনয়কে নারীর সম্মানজনক পেশা হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা তখনো গড়ে ওঠেনি। বিশেষত সমাজের প্রান্তিক অবস্থান থেকে আসা নারীরাই এই পেশায় প্রবেশের সুযোগ পেতেন। তাঁদের শ্রম ও প্রতিভার ওপর নির্ভর করে নাট্যপ্রতিষ্ঠানগুলো এগিয়ে চললেও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে সেই নারীরা থেকে যেতেন বাইরে।

বিনোদিনীর অভিনয়জীবনের বিকাশে গিরিশচন্দ্র ঘোষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর তত্ত্বাবধানে বিনোদিনী অভিনয়ের নানা কৌশল আয়ত্ত করেন এবং দ্রুত বাংলা মঞ্চের প্রধান অভিনেত্রীদের একজন হয়ে ওঠেন। পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটকে বিচিত্র চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। কখনো চৈতন্য, কখনো বিলাসিনী, কখনো অন্য কোনো জটিল চরিত্রের মনস্তত্ত্ব ফুটিয়ে তুলেছেন অভিনয়ের মাধ্যমে। তাঁর অভিনয়প্রতিভার স্বীকৃতি শুধু জনপ্রিয়তায় সীমাবদ্ধ ছিল না; সমকালীন নাট্যসমালোচনা ও স্মৃতিচারণেও তাঁর দক্ষতার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বিনোদিনীর নিজের লেখা পড়লে বোঝা যায়, এই সাফল্যের পেছনে ছিল কঠোর অনুশীলন, আত্মনিবেদন এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা ত্যাগ।

তাঁর আত্মকথার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি নিজের জীবনকে কেবল সাফল্যের কাহিনি হিসেবে উপস্থাপন করেননি। বরং বারবার ফিরে এসেছেন অপমান, প্রতিশ্রুতিভঙ্গ, সামাজিক অবজ্ঞা ও ব্যক্তিগত বেদনার প্রসঙ্গে। যে রঙ্গমঞ্চ তাঁকে পরিচিতি দিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই তাঁর জীবনের গভীর হতাশার উৎস হয়ে উঠেছিল। স্টার থিয়েটার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই দ্বন্দ্ব বিশেষভাবে স্পষ্ট। ১৮৮৩ সালে কলকাতায় স্টার থিয়েটার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে বিনোদিনীর ব্যক্তিগত ত্যাগ ও অবদান জড়িয়ে ছিল। নতুন নাট্যশালা নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তাঁকে ব্যক্তিগত জীবনে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। তাঁর আত্মকথায় থিয়েটারটির নাম তাঁর নামে রাখার প্রতিশ্রুতি পূরণ না হওয়ার বেদনা উঠে এসেছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের নাম হয় স্টার থিয়েটার। এই ঘটনা কেবল একজন অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত আক্ষেপ নয়; শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নারীর অবদান ও তাঁর স্বীকৃতির মধ্যকার বৈষম্যেরও দৃষ্টান্ত।

বিনোদিনীর জীবনের এই পর্বটি বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। কারণ তিনি শুধু মঞ্চে অভিনয় করতেন না; একটি নাট্যপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠা ও বিকাশের সঙ্গেও তাঁর শ্রম, সম্পর্ক ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত জড়িয়ে ছিল। অথচ প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ইতিহাসে ক্ষমতা ও মালিকানার কেন্দ্রে ছিলেন পুরুষেরা। একজন নারী শিল্পীর প্রতিভা ও ত্যাগ প্রয়োজনীয় হলেও তাঁর নাম ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের অংশ হবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর হাতে ছিল না। এখানে শিল্পের জগৎ আর বৃহত্তর সমাজের ক্ষমতার কাঠামো আলাদা থাকে না। সমাজে নারীর যে অবস্থান, নাট্যপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেও তার প্রতিফলন দেখা যায়।

স্টার থিয়েটারে চৈতন্যলীলা নাটকে বিনোদিনীর অভিনয় তাঁর শিল্পীজীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা। এই অভিনয়কে ঘিরে শ্রীরামকৃষ্ণের উপস্থিতি ও আশীর্বাদের বিবরণ নাট্যইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। ধর্মীয় চরিত্রে এক সমাজনিন্দিত অভিনেত্রীর অভিনয় এবং সেই অভিনয়ের আধ্যাত্মিক স্বীকৃতি সমকালীন সামাজিক মূল্যবোধের এক জটিল বৈপরীত্য প্রকাশ করে। মঞ্চে বিনোদিনী দেবতুল্য চরিত্র ধারণ করতে পারতেন, দর্শকের ভক্তি ও আবেগ জাগাতে পারতেন; অথচ মঞ্চের বাইরে তাঁর সামাজিক পরিচয় বদলে যেত না। অভিনয়ের ক্ষমতা তাঁকে মুহূর্তের জন্য অন্য এক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করলেও বাস্তব সমাজ সেই মর্যাদা স্থায়ীভাবে দিতে প্রস্তুত ছিল না।

১৮৮০–এর দশকের শেষভাগে বিনোদিনী পেশাদার রঙ্গমঞ্চ থেকে সরে দাঁড়ান। তখনো তাঁর বয়স তেইশের কাছাকাছি। এত অল্প বয়সে একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেত্রীর অভিনয়জীবনের অবসান বাংলা নাট্যইতিহাসের একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর আত্মকথা থেকে ব্যক্তিগত আঘাত, হতাশা ও সম্পর্কের জটিলতার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে তাঁর অবসরের সিদ্ধান্তকে একটি মাত্র ঘটনার পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। আত্মজীবনী স্মৃতিনির্ভর রচনা; সেখানে লেখক নিজের অভিজ্ঞতাকে নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্গঠন করেন। তাই বিনোদিনীর বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি সমকালীন নাট্যইতিহাসের অন্যান্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে পড়াও প্রয়োজন।

রঙ্গমঞ্চ ছেড়ে দেওয়ার পরও তাঁর জীবনের সংগ্রাম শেষ হয়নি। ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্তানের মৃত্যু এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাঁর কন্যা শকুন্তলার মৃত্যু আত্মকথায় বিশেষ বেদনাময় স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে। মাতৃত্ব, ভালোবাসা ও হারানোর অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি মিশে গেছে। ফলে আমার কথা কেবল একজন অভিনেত্রীর পেশাগত স্মৃতিচারণ নয়; এটি এমন এক নারীর আত্মপরিচয় অনুসন্ধান, যিনি জীবনের নানা পর্যায়ে অন্যের বিচার ও সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছেন।

বিনোদিনীর আত্মকথার ভাষাতেও এই আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব লক্ষ করা যায়। তিনি কখনো নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন গভীর আত্মগ্লানি ও ধর্মীয় অনুশোচনার ভাষায়, কখনো প্রকাশ করেছেন অভিমান, ক্ষোভ এবং নিজের প্রতি সংঘটিত অবিচারের স্মৃতি। আজকের দৃষ্টিতে তাঁর এই আত্মসমালোচনাকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা মনে হতে পারে। কিন্তু যে সমাজে একজন অভিনেত্রীকে তাঁর পেশা ও সামাজিক উৎসের কারণে নৈতিকভাবে বিচার করা হতো, সেখানে নিজের জীবন প্রকাশ্যে বর্ণনা করার জন্য তাঁকে সেই সমাজের ভাষার সঙ্গেই বোঝাপড়া করতে হয়েছে। তাঁর লেখায় আত্মনিন্দা যেমন আছে, তেমনি আছে নিজের শ্রম ও অবদানের স্বীকৃতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই দুই প্রবণতা পরস্পরবিরোধী মনে হলেও একসঙ্গে পড়লেই তাঁর অবস্থানের জটিলতা বোঝা যায়।

আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। বিনোদিনী এমন এক সময়ে নিজের জীবন লিখেছেন, যখন নারীর আত্মজীবনী রচনার পরিসর ছিল সীমিত। তার ওপর তিনি ছিলেন পেশাদার অভিনেত্রী, যাঁর সামাজিক অবস্থান তথাকথিত ভদ্রমহিলার স্বীকৃত পরিচয়ের বাইরে। ফলে তাঁর লেখার সাহস শুধু ব্যক্তিগত ঘটনা প্রকাশে নয়; নিজের মতো একজন নারীর জীবনকেও ইতিহাসের উপাদান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মধ্যে। তিনি দেখিয়েছেন, রঙ্গমঞ্চের ইতিহাস কেবল নাট্যকার, পরিচালক, উদ্যোক্তা কিংবা প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস নয়। অভিনেত্রীর শরীর, কণ্ঠ, শ্রম, প্রশিক্ষণ, সম্পর্ক ও অপমানের অভিজ্ঞতাও সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

রাসসুন্দরী দেবীর আমার জীবন এবং বিনোদিনীর আমার কথা পাশাপাশি পড়লে ঊনিশ শতকের বাংলায় নারীর দুই ভিন্ন সামাজিক পরিসর সামনে আসে। রাসসুন্দরী অন্দরমহলের গৃহস্থালি জীবনের ভেতর থেকে নিজের কণ্ঠ খুঁজে পেয়েছিলেন। বিনোদিনী প্রকাশ্য মঞ্চে বিপুল দর্শকের সামনে দাঁড়িয়েও নিজের জীবনের কর্তৃত্ব নিয়ে সংগ্রাম করেছেন। একজনের কাছে অক্ষর শেখা ছিল গোপন সাধনা, অন্যজনের কাছে অভিনয় ছিল প্রকাশ্য শিল্পচর্চা। কিন্তু দুজনের আত্মকথাই জানায়, নারীর দৃশ্যমানতা আর নারীর স্বাধীনতা এক বিষয় নয়। ঘরের আড়ালে থাকা নারী যেমন নিজের জীবন সম্পর্কে বলার অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তেমনি জনসমক্ষে প্রশংসিত নারীও নিজের শ্রমের মর্যাদা ও সিদ্ধান্তের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

বিনোদিনী দাসীর আত্মকথা তাই বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসের একটি মূল্যবান দলিল হওয়ার পাশাপাশি নারীর সামাজিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাঁর লেখায় শিল্পের সাফল্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে সেই সাফল্যের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা ব্যক্তিগত ক্ষত। শতবর্ষেরও বেশি সময় পর তাঁর জীবন ফিরে পড়ার তাৎপর্য এখানেই– যে নারী মঞ্চে অসংখ্য চরিত্রকে জীবন দিয়েছিলেন, নিজের আত্মকথায় তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনকেই ইতিহাসের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছেন।

তথ্যসূত্র: ১. বিনোদিনী দাসী, আমার কথা (প্রথম প্রকাশ ১৯১২) এবং আমার অভিনেত্রী জীবন (ধারাবাহিক প্রকাশ ১৯২৪–২৫)।

২. রিমলি ভট্টাচার্য সম্পাদিত ও অনূদিত, My Story and My Life as an Actress, Kali for Women, 1998।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ