পোশাক খাতে চলমান আন্দোলন উসকে দিতে গোপনে অর্থ দেওয়ার অভিযোগে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব শনাক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ( এনবিআর ) । সন্দেহভাজন ২০৪ ব্যক্তি ও তাদের ১০০ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ বা লেনদেন স্থগিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে চিঠি দিয়েছে সংস্থাটি। একই অভিযোগে ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়া হয়েছে ১০৪টি প্রতিষ্ঠানের। এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট থেকে দেওয়া হয়েছে এ চিঠি। আগামীর সময়কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। যাদের ব্যাংক হিসাবের বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে , তাদের বেশিরভাগই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। তালিকায় সাবেক মন্ত্রী , সাবেক সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের নাম রয়েছে। তাদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করে এনবিআরের কয়েক কর্মকর্তা বলেছেন , প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধানে দেখা যায় যে , পোশাক খাতে অস্থিরতা তৈরির উদ্দেশ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ৪০ থেকে ৫০টি গ্রুপ খোলা হয়। প্রতিটি গ্রুপের সঙ্গে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তাদের মধ্যে কয়েকজনকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এবং কাউকে নগদ অর্থ দিয়ে সহায়তা করার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব অর্থের উৎস ও লেনদেনের ধরন জানতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক হিসাবের বিস্তারিত বিবরণ চেয়েছে এনবিআর। ‘ গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ২০৪ ব্যক্তি ও তাদের প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন এবং ব্যাংক হিসাব নজরদারিতে আনা হয়েছে। অধিকতর যাচাই – বাছাইয়ের জন্য কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ করা যাচ্ছে না। ব্যক্তির ক্ষেত্রে তাদের ব্যাংক হিসাব স্থগিত ও তল্লাশি — উভয়টি করা হচ্ছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবসা চালু রাখার স্বার্থে শুধু তল্লাশি এবং নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে ’— যোগ করলেন তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আগামীর সময়কে বলেছেন , ‘ কিছু সরকারি সংস্থার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমরা ব্যাংকগুলোকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাব শনাক্ত ও স্থগিত করার নির্দেশ দিয়েছি। এর বাইরে আরও বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্যও চেয়েছি। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে পরিচালিত কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অর্থের উৎস ও লেনদেনের ধরন অনুসন্ধান করতেই এ উদ্যোগ। পাঁচ দিন ধরে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে টানা আন্দোলন করছেন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কয়েকশ কারখানা পর্যায়ক্রমে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় মালিকপক্ষ। পাশাপাশি দ্রুত মজুরি বোর্ডও ঘোষণা দেওয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে। তবে নানা উদ্যোগের পরও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে এর পেছনে তৃতীয় শক্তির অনুসন্ধানে নামে সরকার। কয়েক কর্মকর্তা জানালেন , সন্দেহভাজন তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম , সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান , সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি , সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম , সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী। এ ছাড়া প্রভাবশালী শিল্প গ্রুপের মধ্যে তুষকা গ্রুপের ফয়জুর রহমান বাদল , ওয়েল গ্রুপের আবদুস সালাম , নিপা গ্রুপের খসরু চৌধুরী এবং স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের এ কে এম মোশাররফ হোসাইন , বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচির নামও রয়েছে তালিকায়। তাদের মধ্যে অনেকে বর্তমানে হয় কারাগারে অথবা পলাতক আছেন। চলমান পোশাক খাতের অস্থিরতায় সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচি মিরপুরে নাশকতার পরিকল্পনা এবং অর্থায়ন করেছেন বলে সন্দেহ করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। এ কারণে তাদের স্ত্রীদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনও স্থগিত করা হয়েছে। তালিকার শীর্ষে মণ্ডল গ্রুপের ২৮ প্রতিষ্ঠান এনবিআর কর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় , মণ্ডল গ্রুপ নজরদারির তালিকায় শীর্ষ। এই শিল্প গ্রুপের ২৮টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব কোম্পানির মধ্যে আছে মণ্ডল ইন্টিমেটস লিমিটেড , কটন ফিল্ড ( বিডি ) লিমিটেড , কটন ক্লাব ( বিডি ) লিমিটেড , কটন ক্লোথিং ( বিডি ) লিমিটেড , মণ্ডল ফেব্রিক্স লিমিটেড , ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেড , মার্ক সোয়েটার লিমিটেড , মন ট্রিমস লিমিটেড , মণ্ডল স্পিনিং মিলস লিমিটেড , মণ্ডল ফার্মিং অ্যান্ড ফুড প্রসেসিং লিমিটেড , আলিম নিট ( বিডি ) লিমিটেড , মণ্ডল সিকিউরিটিজ লিমিটেড , অ্যাপোলো ফ্যাশন লিমিটেড , ট্রিমস ইন্টারন্যাশনাল ( বিডি ) লিমিটেড , ইকো ইন্টিমেটস লিমিটেড , নূর চেকস অ্যান্ড স্ট্রাইপস লিমিটেড , অ্যাপোলো নিটওয়্যার ( বিডি ) লিমিটেড , অ্যাপোলো প্যাকেজিং ( বিডি ) লিমিটেড , কটন ক্লাউট ( বিডি ) লিমিটেড , নিটেক্স ড্রেসেস লিমিটেড , এমব্রেলা লিমিটেড , মণ্ডল অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড , মণ্ডল নিট কম্পোজিট লিমিটেড , মণ্ডল নিটওয়্যারস লিমিটেড , মণ্ডল ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড , মনটেক্স ফেব্রিক্স লিমিটেড , পানামা অ্যাগ্রো কমপ্লেক্স লিমিটেড এবং জিগজ্যাগ স্টুডিও ( বিডি ) লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে — আব্দুল আলিম মণ্ডল , তারিন তাসলিমা , জুবায়ের মণ্ডল , সুলতানা খাতুন , মাসুদা খাতুন , হাজি আব্দুল মান্নান মণ্ডল , মোমেনা খাতুন , আব্দুল মোমিন মণ্ডল , মাহমুদুল হাসান , জান্নাতুল ফেরদৌস , আসাদুর রহমান সিকদার , গোলাম ফারুক তালুকদার , মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন , সুরভী রহমান , শিরিন সুলতানা , তাসলিমা আক্তার , খন্দকার ফারুক কায়সার , নাহিদ খন্দকার ও হাজি আব্দুল মজিদ মণ্ডল। দ্বিতীয় শীর্ষে তুষকা গ্রুপের ৯ প্রতিষ্ঠান তুষকা গ্রুপের ৯টি প্রতিষ্ঠান অর্থায়নের সঙ্গে জড়িত ছিল কি না , তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো হলো — ‘ স্টিচেস লিমিটেড , তুষকা প্যাকেজিং লিমিটেড , তুষকা অ্যাপারেলস লিমিটেড , তুষকা ফ্যাশনস লিমিটেড , তুষকা ওয়াশিং লিমিটেড , তুষকা ডেনিম লিমিটেড , তুষকা প্রসেসিং লিমিটেড , তুষকা জিন্স লিমিটেড ও তুষকা ট্রাউজার্স লিমিটেড। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক হিসেবে ফিরোজ আলম , রাফায়েত উল্লাহ খান , শফিকুল ইসলাম , ইকবাল কবির , ফয়জুর রহমান , এরশাদ জামাল , একরামুল হক , আতিকুজ্জামান ( সাগর ) ও আতিকুজ্জামানের ( রিপন ) ব্যাংক হিসাবের লেনদেনও স্থগিত করা হয়েছে। গিভেন্সি গ্রুপের ৫ প্রতিষ্ঠান গিভেন্সি গার্মেন্টস লিমিটেড , গিভেন্সি স্পিনিং মিলস লিমিটেড , গিভেন্সি গার্মেন্টস এক্সেসরিজ লিমিটেড , গিভেন্সি ইয়ার্ন ডাইং লিমিটেড ও গিভেন্সি ফুডস অ্যান্ড এসেনশিয়ালস লিমিটেড। এই কোম্পানিগুলোর পরিচালক – খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল , মাসুমা খাতুন লিপা , মাহমুদা খাতুন ও খতিব আব্দুল হাদীদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেনও স্থগিত করা হয়েছে। এনভয় গ্রুপের ৫ প্রতিষ্ঠান এনভয় গার্মেন্টস লিমিটেড , এনভয় প্যাকেজিং লিমিটেড , এনভয় ডিজাইন লিমিটেড , এনভয় ফ্যাশন লিমিটেড এবং এনভয় টেকনোলজি ( প্রাইভেট ) লিমিটেড রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিক আবদুস সালাম মুর্শেদী , রাশিদা আহমেদ , শারমীন ইসলাম , তানভীর আহমেদ ও শেহরীন সালাম ঐশীর ব্যাংক হিসাবের লেনদেনও স্থগিত করা হয়েছে। স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ৩ প্রতিষ্ঠান স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের ‘ স্ট্যান্ডার্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড , দ্য সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড , সাগর ইনফো বিল্ডার্স লিমিটেড ’ জড়িত। এই কোম্পানিগুলোর মালিক ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম মোশাররফ হোসেন , হোসনেয়ারা বেগম , ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান , মাহমুদা বেগম , তাসমিয়া রহমান , হাসনাত মোশাররফ , ফারিয়া রহমান , ফাহিম মোশাররফ এবং হাসিব মোশাররফদের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত। নিপা গ্রুপের ৩ প্রতিষ্ঠান নিপা গ্রুপের তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ‘ মেসার্স নিপা নিটওয়্যার কোম্পানি , সেলিনা অ্যাপারেলস লিমিটেড , নিপা ফ্যাশন ওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ’ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মালিক সানজিদ চৌধুরী , খসরু চৌধুরী , এম মুনিরুল ইসলাম এবং টিপু সুলতানের ব্যাংক হিসাবের লেনদেন স্থগিত। ওয়েল গ্রুপের ৩ প্রতিষ্ঠান ওয়েল গ্রুপের ‘ ওয়েল এক্সেসরিজ লিমিটেড , ওয়েল ফ্যাশন লিমিটেড , ওয়েল ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কোম্পানি লিমিটেড ’- এর মালিক নাসরিন আক্তার , আব্দুস সালাম , সৈয়দ নুরুল ইসলাম , সৈয়দ সিরাজুল ইসলাম , সৈয়দ নজরুল ইসলাম , সৈয়দ শহিদুল ইসলাম , সৈয়দ তরিকুল ইসলাম , আসিফ হাসান , জান্নাতুল ইসলাম , আফরোজা বেগম , ডা . নাসরীন আফরোজ , আক্তারুন্নেসা ও জিনাত ইসলামের ব্যাংক হিসাবও স্থগিত।