চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) আমদানি ব্যয় পরিশোধে হঠাৎ উল্লম্ফনে বাণিজ্য ঘাটতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এতে বাংলাদেশের বাহ্যিক বা বৈদেশিক বাণিজ্য খাত— নতুন ও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত হালনাগাদ তথ্যে এই চিত্র উঠে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৪৭ বিলিয়ন ডলারে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৫.৭১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইপিজেডসহ ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) মূল্যে মোট আমদানি ব্যয় ১৫.১ শতাংশ বেড়ে ১৯.৩৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৬.৮ বিলিয়ন ডলার। কেবল জুলাই–আগস্ট মাসেই আমদানি ব্যয় দাঁড়ায় ১২.২০ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম)-এর মহাপরিচালক ড. মো. এজাজুল ইসলাম টিবিএসকে জানান, "জুলাই-আগস্টে মোট আমদানির পরিমাণ যেখানে ১২ বিলিয়ন ডলার ছিল, সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে ১৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে—অর্থাৎ এক মাসেই আমদানি ব্যয় প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।"
তিনি বলেন, "আমদানির বৃদ্ধির তুলনায় রপ্তানি সেভাবে বাড়েনি। রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ৩ বিলিয়ন ডলারের মতো, যার ফলে আমদানি ও রপ্তানির মধ্যকার ব্যবধান অনেকটাই বেড়ে গেছে।"
"বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামসহ আমদানিকৃত বিভিন্ন কাঁচামাল ও পণ্যের দাম বেশি থাকায়– সামগ্রিক আমদানি মূল্য অনেক বেশি দিতে হচ্ছে," তিনি বলেন।
অন্যদিকে, এই সময়ে রপ্তানি আয় (ইপিজেডসহ এফওবি মূল্যে) ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১১.৮৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছর ছিল ১১.০৮ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া শিপমেন্ট বা চালানভিত্তিক মোট রপ্তানি ৬.৪ শতাংশ বেড়ে ১৩.০৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
এর মধ্যে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের রপ্তানি ৬.২ শতাংশ বেড়ে পেয়ে ১০.৫৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৯.৯২ বিলিয়ন ডলার।
চলতি হিসাবের ভারসাম্য ঋণাত্মক ধারায়
এক মাস আগেও বাংলাদেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্য উদ্বৃত্ত অবস্থানে থাকলেও, সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে তা ঋণাত্মক বা ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে। অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে চলতি হিসাবের এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১.৩ বিলিয়ন ডলারে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮২১ মিলিয়ন ডলার। অথচ এর মাত্র এক মাস আগেও চলতি হিসাব ৫৯১ মিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছিল।
এ বিষয়ে ড. এজাজ বলেন, "আমাদের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট পজিটিভ ছিল, এটাই থাকার কথা, কারণ এখন রেমিট্যান্সে গ্রোথ ভালো। তবে সেপ্টেম্বর শেষে এটা নেগেটিভ হয়েছে। মূলত আমদানির ব্যয় অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ার কারণেই কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্স নেগেটিভ বা ঘাটতিতে রূপ নিয়েছে।"
মূলধন হিসাব, আর্থিক হিসাব এবং ভুল ও বাদপড়া খাত বাবদ ২৫৯ মিলিয়ন ডলার সমন্বয় করার পর দেশের সার্বিক লেনদেন ভারসাম্য বা ওভারঅল ব্যালেন্স অফ পেমেন্টস-এ ১.১৬ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর ফলে সমপরিমাণ নিট রিজার্ভ সম্পদও সমন্বয় করতে হয়েছে।
বহিঃবাণিজ্য খাতের অন্যান্য খাতের ঘাটতি সামাল দিতে প্রধান ও নির্ভরযোগ্য নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স। আলোচ্য সময়ে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স ১৩.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ৭.৫৮ বিলিয়ন ডলার। এটি বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান বলেন, "এলএনজির দরবৃদ্ধির কারণে এখন ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিদেশি ঋণ ছাড়—সে হারে বাড়ছে না। যে কারণে ডলারের চাহিদা বেড়ে এভাবে দর বাড়ছে।"
তিনি বলেন, "বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে এখনকার ডলার বাজারে এই খারাপ অবস্থা তৈরি হয়েছে।"
এদিকে, আর্থিক হিসাবে সামান্য ইতিবাচক প্রবাহ বজায় থাকলেও— তা মাত্র ৩২৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১.৭৯৬ বিলিয়ন ডলার। এই সময়ে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই ৩৫৮ মিলিয়ন ডলারে তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও— মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি (এমএলটি) বৈদেশিক ঋণ ছাড় প্রায় ৪৮ শতাংশ কমে ৫৪২ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
এজাজুল ইসলাম বলেন, "পোর্টফোলিও ইনভেস্টমেন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কারণে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টের নিট প্রবাহও—গত বছরের ১.৭৯ বিলিয়ন ডলার থেকে আশঙ্কাজনকভাবে কমে, মাত্র ৩২৩ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর শেষ নাগাদ দেশের মোট বা গ্রস বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬.০১ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩১.১৯ বিলিয়ন ডলারে। এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৪.৮ মাসের পণ্য ও সেবা আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। আর শুধু পণ্য আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে ৫.৩ মাসের।
এজাজুল ইসলাম বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যারেলপ্রতি ১১৭ ডলারের মতোন তেলের উচ্চমূল্য, একইসঙ্গে নিত্যপণ্যের দর চড়া থাকায় অক্টোবর, নভেম্বর ও ডিসেম্বরেও ট্রেড ব্যালেন্স এবং চলতি হিসাবের ঘাটতির এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা (আপট্রেন্ড) বজায় থাকতে পারে।"
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, "জ্বালানি সংকট মেটাতে স্পট মার্কেট থেকে অনেক বেশি দরে এলএনজি কিনতে হচ্ছে। যার কারণে ট্রেড ডেফিসিট (বাণিজ্য ঘাটতি) বেড়েছে। সামনের দিনে রপ্তানির পরিমাণ বাড়লে এই ঘাটতির পরিমাণ কমে যাবে।"
বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সচল রাখতে—আমদানির চাপ বাড়লে, বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার এবং রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে। এই চাপ সামাল দিতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাপান এবং আইএমএফ থেকে নতুন অর্থায়নের প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ডলারের দর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে থমকে গেছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার প্রবণতা। বর্তমানে গ্রস রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৬.৪৩ বিলিয়নে, যা এর আগে গত ১ সেপ্টেম্বরে ৩৭.৪১ বিলিয়নে উঠেছিল।
আর আইএমএফের হিসাব পদ্ধতি বিপিএম৬ অনুযায়ী, রিজার্ভ নেমেছে ৩১.৫৬ বিলিয়ন ডলারে। গত ১ সেপ্টেম্বর যা ছিল ৩২.৫০ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের ২৯ জুন প্রথমবারের মতো গ্রস রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘর অতিক্রম করে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.