নতুন গবেষকদের অনেকে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও পদ্ধতি নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তিতে থাকেন। গুণগত গবেষণার ধারণা, পদ্ধতি, চ্যালেঞ্জ এবং নবীন গবেষকদের করণীয় নিয়ে কথা বলেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশের (এআইইউবি) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আসিফ কামাল। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আবিদ আনজুম ত্রিদিব।
গুণগত গবেষণা মানুষের অভিজ্ঞতা, মতামত, অনুভূতি, আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, পরিমাণগত গবেষণা মূলত সংখ্যা ও পরিসংখ্যানের মাধ্যমে কোনো বিষয়কে পরিমাপ ও তুলনা করে। সহজভাবে বললে, পরিমাণগত গবেষণা জানতে চায় ‘কত?’, আর গুণগত গবেষণা জানতে চায় ‘কীভাবে?’ ও ‘কেন?’। অর্থাৎ, কোনো বিষয় সম্পর্কে পরিমাণগত তথ্যের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত অর্থ ও অভিজ্ঞতা বোঝার জন্য গুণগত গবেষণা প্রয়োজন।
যখন গবেষণার বিষয় মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, দৃষ্টিভঙ্গি, সংস্কৃতি, পরিচয় বা কোনো জটিল সামাজিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত হয় এবং আমরা এর কারণ বা অর্থ বুঝতে চাই, তখন গুণগত গবেষণা বেশি উপযোগী। কোনো বিষয়ে পূর্ববর্তী গবেষণা সীমিত থাকলে বা নতুন কোনো বিষয় গভীরভাবে অনুসন্ধান করতে চাইলে গুণগত গবেষণা কার্যকর। এটি গবেষককে অংশগ্রহণকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি বোঝার সুযোগ দেয়।
প্রথমে গবেষণা প্রশ্ন স্পষ্ট করতে হবে। গবেষণার উদ্দেশ্য এবং প্রশ্নের ওপর নির্ভর করেই তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নির্বাচন করা উচিত। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং মতামত জানতে চাইলে সাক্ষাৎকার উপযোগী। কোনো গোষ্ঠীর সম্মিলিত মতামত বা বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাইলে ফোকাস গ্রুপ কার্যকর হতে পারে। আবার বাস্তব আচরণ পর্যবেক্ষণ করতে চাইলে অবজারভেশন বেশি উপযুক্ত। অর্থাৎ, গবেষণা প্রশ্নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পদ্ধতি নির্বাচন করতে হবে।
গুণগত গবেষণায় সাধারণত গবেষণার বিষয় সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা বা জ্ঞান রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নির্বাচন করা হয়। একজন নবীন গবেষককে অংশগ্রহণকারীদের প্রাসঙ্গিকতা, বৈচিত্র্য, অভিজ্ঞতা এবং গবেষণার উদ্দেশ্য বিবেচনা করতে হবে। সঠিক অংশগ্রহণকারী নির্বাচন গবেষণার মান এবং ফলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
গুণগত সাক্ষাৎকারের প্রশ্ন হওয়া উচিত খোলামেলা, সহজ ও নিরপেক্ষ। অংশগ্রহণকারীকে নিজের অভিজ্ঞতা ও মতামত প্রকাশের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ দিতে হবে। গবেষককে মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুসারী প্রশ্ন করতে হবে। নিজের ব্যক্তিগত মতামত অংশগ্রহণকারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীর গোপনীয়তা এবং অবহিত সম্মতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
থিমেটিক অ্যানালাইসিসের জন্য প্রথমে সাক্ষাৎকার বা পর্যবেক্ষণ থেকে সংগৃহীত তথ্য ভালোভাবে পড়তে হয়। এরপর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বা ধারণাগুলোকে ছোট ছোট কোড দিতে হয়। একই ধরনের কোড একত্র করে ক্যাটাগরি এবং বৃহত্তর থিম তৈরি করা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ‘ভয়’, ‘আত্মবিশ্বাসের অভাব’ এবং ‘কথা বলতে দ্বিধা’ এই কোডগুলো থেকে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যাংজাইটি’ নামের একটি থিম তৈরি হতে পারে। এভাবে বিপুল তথ্য থেকে অর্থবহ প্যাটার্ন ও গবেষণার ফল বের করা হয়।
গবেষককে নিজের ধারণা ও ব্যক্তিগত পক্ষপাত সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে এবং রিফ্লেক্সিভিটি বজায় রাখতে হবে। পাশাপাশি তথ্যের যথাযথ নথিভুক্তকরণ, অংশগ্রহণকারীর বক্তব্য সরাসরি ব্যবহার, একাধিক তথ্যের উৎস বা পদ্ধতির ট্রায়াঙ্গুলেশন এবং সহকর্মী বা তত্ত্বাবধায়কের মতামত নেওয়া যেতে পারে। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ানো সম্ভব।
নবীন গবেষকদের সাধারণ ভুলের মধ্যে রয়েছে অস্পষ্ট গবেষণা প্রশ্ন, লিডিং প্রশ্ন ব্যবহার, অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ, তথ্য যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা এবং খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া।
এসব সমস্যা এড়াতে গবেষণার শুরুতে একটি পরিষ্কার গবেষণা পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি তথ্য সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে নিয়মিত বিশ্লেষণ ও রিফ্লেকশন চালিয়ে যেতে হবে।
গুণগত গবেষণায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিপুল ও জটিল তথ্য বিশ্লেষণ করা এবং গবেষকের পক্ষপাত নিয়ন্ত্রণ করা। আমি তথ্য ধাপে ধাপে সংগঠিত করে কোডিং ও থিমেটিক অ্যানালাইসিস করেছি। পাশাপাশি নিজের ব্যাখ্যা বারবার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহকর্মী বা তত্ত্বাবধায়কের মতামত নিয়েছি। এতে বিশ্লেষণ আরও সুশৃঙ্খল ও বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে।
প্রথমে ছোট ও পরিষ্কার একটি গবেষণা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করতে বলব। ভালো গুণগত গবেষণা পড়া, গবেষণাপদ্ধতি বোঝা, উপযুক্ত তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি নির্বাচন করা এবং কোডিং ও বিশ্লেষণ ধৈর্যের সঙ্গে শেখা জরুরি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুধু অংশগ্রহণকারী কী বলেছে তা নয়, তারা কেন এবং কী অর্থে বলেছে, সেটি বোঝার চেষ্টা করতে হবে। একজন ভালো গুণগত গবেষক হওয়ার জন্য কৌতূহল, ধৈর্য ও গভীর বিশ্লেষণী চিন্তার প্রয়োজন।