মামলাবাণিজ্য, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জমি ও ফ্ল্যাট ব্যবসায় সম্পৃক্ততা, মাদক কারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায় এবং অফিসে বসেই মাদক সেবনের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে রংপুর সিআইডির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। এসব অনিয়মের কারণে গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত কার্যক্রমও প্রশ্নের মুখে পড়ছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের অনিয়ম আড়াল করতে অফিসের একটি অংশ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের আবরণ তৈরির চেষ্টা করছে।
রংপুর সিআইডি অফিসের একটি সূত্র আমার দেশকে জানায়, কনস্টেবল থেকে শুরু করে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত। জমি কেনাবেচা ও ফ্ল্যাট ব্যবসার পাশাপাশি মামলার দালালিতেও তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রটি আরো দাবি করে, আদালতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান জমিজমাসংক্রান্ত মামলায় বাদীপক্ষের হয়ে বিবাদীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। এ কাজে কনস্টেবল সাদ্দাম, সৈয়দ আলী, নাইমুর, হাসানুজ্জামান ও কনস্টেবল তরিকুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া এসআই আহাদ, অফিস সহকারী আবুল হাশেম এবং কনস্টেবল সাদ্দাম, নাইমুল ও সৈয়দ আলীর বিরুদ্ধে নীলফামারীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজনকে ধরে এনে রংপুর সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরীসহ রুদ্ধদ্বার কক্ষে টাকা-পয়সার দফারফার পর তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তরের অভিযোগও করেছে সূত্রটি।
সরকারি গাড়ির জ্বালানি নিয়ে প্রশ্ন
সূত্রটির দাবি, সুমিত চৌধুরী সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের হিসাবেও অনিয়ম করেছেন। ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই ১৫০ লিটার, ২৪ আগস্ট ১৫০ লিটার, ১৫ সেপ্টেম্বর ১৮০ লিটার এবং ২১ নভেম্বর ১৫০ লিটার জ্বালানি তেল উত্তোলন দেখানো হয়। এছাড়া একই বছরের ১৭ জুলাই ধাপেরহাটের নীলদরিয়া, ১৫ আগস্ট নীলফামারীর ঢেলাপীর এবং দিনাজপুরের রামসাগরে সরকারি গাড়ি নিয়ে মাছ ধরতে যাওয়ার নামে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যবহারের হিসাব দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তিনি বিভিন্ন জেলায় মাছ ধরতে যাওয়াসহ সব সময় পরিবারের সদস্যদের কাজে সরকারি গাড়ি ব্যবহার করেন।
সূত্রটির ভাষ্য, রংপুর সিআইডি অফিসে মোট পাঁচটি মোটরসাইকেল রয়েছে। এর মধ্যে কিছু যানবাহন দীর্ঘদিন অচল থাকলেও প্রতিটি মোটরসাইকেলের বিপরীতে মাসে ৩০ লিটার করে মোট ১৫০ লিটার জ্বালানি দেখানো হয়। পাশাপাশি নষ্ট ট্রাকের জন্য ২০০ লিটার এবং জিপগাড়ির জন্য ৫০০ লিটার জ্বালানি দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তিনি কনস্টেবল সাদ্দামের মাধ্যমে প্রতি মাসে তেল বিক্রির ৩০ হাজার করে টাকা আলাদাভাবে নেন। তবে এখান থেকে দুই ড্রাইভারকে দুই হাজার টাকা বকশিশ দেন।
এ বিষয়ে কনস্টেবল সাদ্দাম বলেন, জ্বালানি কিনতে গেলে অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে তিনি রসিদে স্বাক্ষর করেছেন। তবে মামলাবাণিজ্য বা অন্য কোনো অনিয়মের সঙ্গে তিনি জড়িত নন। যারা এসব অভিযোগ করেছেন, তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছেন।
সূত্র জানায়, রংপুর সিআইডির কর্মকর্তা সুমিত চৌধুরীর বিরুদ্ধে মাদক ও মদ্যপানের অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের ১ জুন রাজশাহীর টিচার্স ট্রেনিং কলেজের সামনে প্রকাশ্যে মাতলামির অভিযোগে তাকে গণপিটুনির শিকার হতে হয়। পরে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে তদন্ত এবং ডোপ টেস্ট করা হয়। এতে মাদক সেবনের আলামত পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং তাকে তাৎক্ষণিক রাজশাহী থেকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে ফরিদপুর নৌ পুলিশে বদলি করা হয়। পরে নৌ পুলিশে কর্মরত অবস্থায়ও তার বিরুদ্ধে মাদক ও মদ্যপানের অভিযোগ ওঠে।
এছাড়া রংপুর মেট্রো ও জেলার বিভিন্ন মদের দোকান ও ভাটিখানা নামে পরিচিত সব কারখানা থেকে অনুগত কনস্টেবলদের মাধ্যমে মাসোহারা আদায় করে থাকেন সুমিত চৌধুরী।
সিআইডির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সুমিত চৌধুরী ২৫তম বিসিএসের পুলিশ কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে প্রভাবশালী ছিলেন বলে তাদের অভিযোগ।
তারা আরো দাবি করেন, বিগত সরকারের সময় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। এত অপকর্মের পরও এই পুলিশ কর্মকর্তা কীভাবে এখনো রংপুর জেলা এবং মেট্রোর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দায়িত্ব পালন করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা।
রংপুর সিআইডি অফিসের কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, সুমিত চৌধুরী আপাদমস্তক একজন মাতাল, চরিত্রহীন ও দুর্নীতিবাজ। তিনি আপন মামাতো ভাইয়ের স্ত্রী তুলি রানীর সঙ্গে পরকীয়া করে তুলে এনে ভয় দেখিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে। এগুলোর পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি, মদ্যপান ও অসদাচরণসহ নানা অভিযোগে তাকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে ডিমোশন দিয়ে সহকারী পুলিশ সুপার করা হয়েছে। এখনো তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রংপুর জেলা সেক্রেটারি অধ্যাপক ফখরুল আনাম বেনজু আমার দেশকে বলেন, রংপুর জেলা ও মেট্রোপলিটনের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় দক্ষ ও বিতর্কমুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা দরকার। যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ, তাকে কীভাবে রংপুর সিআইডিতে রাখা হয়েছেÑএটি প্রশ্নের বিষয়। তাকে দ্রুত অপসারণ করে পুলিশের ভাবমর্যাদা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি দক্ষ কর্মকর্তাকে এখানে পদায়ন করার দাবি জানান তিনি।
সিআইডি হেডকোয়ার্টারের ডিআইজি (অ্যাডমিন) মিয়া মাসুদ করিম আমার দেশকে বলেন, তার অনেক বিষয়ে আগে থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানেন। বিষয়টি আমি আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।
অভিযোগের বিষয়ে রংপুর সিআইডির পদাবনতিপ্রাপ্ত সহকারী পুলিশ সুপার সুমিত চৌধুরীর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অফিসের সব ইন্সপেক্টর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ডেকে তাদের সামনে অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তিনি বলেন, তিনি কোনো অন্যায়, অনিয়ম বা দুর্নীতি করেন না। তার অধীনস্থ কর্মকর্তারা তার সামনেই রয়েছেন এবং তিনি তাদের সঙ্গে কোনো অন্যায় করেছেন কি না, তারা বলতে পারবেন।
সুমিত চৌধুরী আরো বলেন, এসব অভিযোগের পেছনে তার কোনো শত্রু রয়েছে এবং মিথ্যা তথ্য দিয়ে তাকে হেয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে। অভিযোগকারীকে শনাক্ত করার কথাও জানান তিনি।