রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে গত ১৭ মার্চ দায়িত্ব নেন মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ফরিদুল ইসলাম। দীর্ঘ শিক্ষকতা ও গবেষণার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এই শিক্ষকের দেশ-বিদেশে একাডেমিক কাজের পাশাপাশি রয়েছে ৪০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং শিল্প-একাডেমিয়ার সম্পর্ক জোরদারে বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন আমার দেশকে। একইসঙ্গে ছাত্ররাজনীতি, রাকসুর কার্যক্রম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও নিজের ভাবনা তুলে ধরেছেন সাক্ষাৎকারে।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমার দেশ-এর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ফাহমিদুর রহমান ফাহিম
অধ্যাপক ফরিদ : আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।
আমার দেশ : আপনার যোগদানের প্রায় ছয় মাস পার হয়েছে। যোগদানের পর আপনার প্রধান প্রতিবন্ধকতাগুলো কি ছিল?
অধ্যাপক ফরিদ : পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে উপাচার্যের দায়িত্ব নিয়েছি। আমার আগের উপাচার্যও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতেই দায়িত্ব নিয়েছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জটি অনুভব করেছি, তা হলো সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা।
মনস্তাত্ত্বিকভাবে ছাত্র-শিক্ষক সবাই এক ধরনের অজানা ভয়ের মধ্যে কাজ করেছেন। সবকিছুই ছিল নতুন। ফ্যাসিবাদ দূর হলেও অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এমন পরিবেশে ক্লাসরুম ও গবেষণায় মনোযোগ এবং একাগ্রতা ধরে রাখা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এটি বাইরে থেকে সব সময় বোঝা যায় না, বরং অনুভব করা জরুরি। এটিকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখেছি। আরো অনেক চ্যালেঞ্জ ছিল; তবে এটিই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে।
আমার দেশ : রাবির শিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নে প্রশাসনের প্রধান অগ্রাধিকার কি থাকবে?
অধ্যাপক ফরিদ : শিক্ষা ও গবেষণা দুই ক্ষেত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে উচ্চশিক্ষায় বড় পরিবর্তন এসেছে। উচ্চশিক্ষা এখন ক্রমেই দক্ষতাভিত্তিক হয়ে উঠছে। শুধু পুথিগত বিদ্যা দিয়ে আর চলবে না, শিক্ষার্থীদের সফট স্কিলও অর্জন করতে হবে।
রাজধানীকেন্দ্রিক বা বেশি সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এসব ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রান্তিক অবস্থানে থাকায় অনেক সময় সেই গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না।
আমার মূল লক্ষ্য শিক্ষার্থীরা যেন দক্ষ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে বের হয় এবং চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। আমি চাই গবেষণার মূল লক্ষ্য হোক সমস্যা সমাধান, শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়। ছোট ছোট সমস্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা গবেষণার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করেন। তাই গবেষণার ক্ষেত্রে আমার প্রধান মনোযোগও সেদিকেই।
আমার দেশ : একাডেমিক ক্যালেন্ডার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আপনার পরিকল্পনা কী?
অধ্যাপক ফরিদ : শিক্ষার ক্ষেত্রে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দায়িত্ব নেওয়ার পরই আমি বলেছিলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত সময়ের বাইরে অতিরিক্ত একদিনও অপেক্ষা করতে হবে না। প্রতিটি বিভাগকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে বলেছি, তারা কতদিনের মধ্যে সেশনজট শূন্যে নামিয়ে আনবে, তার একটি রোডম্যাপ জানাতে। বিভিন্ন বিভাগ ইতোমধ্যে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, তারা কতটা সেশনজট কমিয়েছে এবং সামনে তাদের পরিকল্পনা কী। আমরা কোনো কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না। আমরা বিভাগগুলোর কাছ থেকেই সমাধান চাইছি। যেহেতু বিভাগগুলো সভাপতির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়, তাই আমরা চাই তারা নিজেদের সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠুক।
সেশনজট শূন্যে নামিয়ে আনতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন, আমরা তা দিচ্ছি। অটোমেশন থেকে শুরু করে সব ধরনের সহায়তাই করা হচ্ছে। আশা করি খুব দ্রুত সেশনজট কমে আসবে। এটি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার।
আমার দেশ : আমরা দেখেছি, ছাত্র সংসদ হওয়ার পর থেকে নানা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন মন্তব্য ও ঘটনার কারণে প্রায়ই সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হচ্ছে। কিছুদিন আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে। বর্তমান ছাত্ররাজনীতির এই পরিবেশকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
অধ্যাপক ফরিদ : আমার মনে হয় জুলাই গণআন্দোলনের পরবর্তী পরিস্থিতির একটি লিগ্যাসি এখনো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বহন করছে। তবে আগে যে মাত্রায় এসব ঘটত, এখন সেই তীব্রতা অনেকটাই কমেছে এবং আরো কমবে।
আমরা ছাত্রনেতাসহ সবাইকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যে, এখন আর আগের পরিবেশ নেই। ১৭ বছর ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, সে একই ধরনের পরিবেশ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যই কাম্য নয়। জুলাই গণআন্দোলনের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এই পরিস্থিতি অনেক বেশি মোকাবিলা করেছে। সেই ধারাবাহিকতার কিছুটা এখনো রয়ে গেছে।
প্রথমে আমরা সবাইকে বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এখন আমরা নিয়ম অনুযায়ী ডিসিপ্লিন কমিটির মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছি। পরিস্থিতি পরিবর্তন হচ্ছে, তাই সবাইকে নিয়মের মধ্যে আসতে হবে।
আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, নিজেরাই বিচার করে ফেলার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে—সেখান থেকে বের হয়ে আসতে আমরা কাজ করছি।
আমার দেশ : সম্প্রতি পত্রপত্রিকা ও মানুষের মুখে একটি বিষয় বেশি শোনা যাচ্ছে—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এখন একাডেমিক কার্যক্রমের চেয়ে ছাত্ররাজনীতি বা রাকসুর বিভিন্ন কার্যকলাপের কারণেই বেশি আলোচনায় আসছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
অধ্যাপক ফরিদ : বিষয়টি আমাদেরও ভাবাচ্ছে। যারা শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত, তাদেরও এটি ভাবাচ্ছে। ছাত্র সংসদ, প্রশাসন ও শিক্ষক—প্রত্যেকে যদি নিজেদের দায়িত্ব ও সীমারেখা বুঝে চলেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ এমনিতেই স্বাভাবিক হয়ে আসবে।
আমার মনে হয়, আমরা প্রত্যেকে নিজেদের করণীয় ও সীমারেখা কখনো কখনো অতিক্রম করছি। আর সেখান থেকেই এসব সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
আমার দেশ : এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কোনো পরিকল্পনা আছে কী?
অধ্যাপক ফরিদ : দেখুন, চাপিয়ে দেওয়ার চেয়ে মানুষ যদি নিজে বুঝতে পারে যে, তার সীমারেখা কোথায় থাকা উচিত, তবে সেটিই সবার জন্য সবচেয়ে ভালো। কিন্তু যখন বিষয়টি সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন প্রশাসন চুপ থাকতে পারে না। প্রশাসনকে তার দায়িত্ব পালন করতেই হবে।
আমরা অনেকবার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। এবার আমরা কঠোরভাবে ব্যবস্থা নেব, যাতে কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে।
আমার দেশ : রাবিতে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, সেখানে প্রশাসনের কোনো দুর্বলতা
অধ্যাপক ফরিদ : না, আমি প্রশাসনের দুর্বলতা বলব না। প্রশাসন ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছে। কেউ যদি এটিকে প্রশাসনের দুর্বলতা মনে করে বারবার একই ধরনের কাজ করতে থাকে, তাহলে সে ভুল পথে আছে।
আমার দেশ : ভবিষ্যতে ছাত্ররাজনীতিতে বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ড ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে লিখিত কোনো নীতিমালা বা বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা আছে কী?
অধ্যাপক ফরিদ : বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে কোনো নিয়ম করার প্রয়োজন নেই। ডিসিপ্লিনারি কমিটির নিয়ম আগে থেকেই রয়েছে এবং কমিটিও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিচ্ছি। তবে এ ধৈর্য বেশিদিন থাকবে না বা দীর্ঘায়িত হবে না। আমি আশা করি তারা বিষয়টি বুঝবে। কারণ, শিক্ষার্থীরা যথেষ্ট পরিণত। তারা হয়তো আবেগের মধ্যে আছে। শিগগির তারা সেই আবেগ থেকে বেরিয়ে বাস্তবতায় ফিরে আসবে। এটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নয়, দেশবাসীরও প্রত্যাশা।
আমার দেশ : অনেক বছর পর রাকসু নির্বাচন হয়েছে। এতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে আপনি মনে করেন?