দেশে চলমান গ্যাস সরবরাহ সংকটের কারণে সৃষ্ট বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান।
তিনি বলেন, একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রমে দুর্ঘটনার কারণে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটছে।
তবে টার্মিনালটির কার্যক্রম ধাপে ধাপে স্বাভাবিক হলে গ্যাসের সংকটও পর্যায়ক্রমে কমে আসবে এবং বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে।
আজ মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কার্যক্রম তুলে ধরতে গিয়ে তথ্য উপদেষ্টা এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ঢাকার বাইরে দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তীব্র লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে এই পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। সরকার নাগরিকদের দুর্ভোগ সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত এবং সংকট মোকাবিলায় সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের দৈনিক গ্যাসের প্রয়োজন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও দীর্ঘদিন ধরেই সেই পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ সম্ভব হচ্ছে না।
দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে এলএনজির ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। এলএনজি বিদেশ থেকে এনে টার্মিনালে পুনরায় গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
তথ্য উপদেষ্টা জানান, বর্তমানে দেশে পরিচালিত দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক কোম্পানি পরিচালনা করে, সেখানে সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনাটি বড় ধরনের না হলেও টার্মিনালটি আপাতত পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করতে পারছে না। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
তিনি বলেন, এই ঘাটতির প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই নয়, শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি এবং সিএনজি স্টেশনেও পড়েছে।
অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় মানুষ স্বাভাবিকভাবে রান্নাবান্নাও করতে পারছেন না।
শিল্প প্রতিষ্ঠানের অনেক ক্যাপটিভ বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বন্ধ বা সীমিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান এখন জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রেখেছে। সাধারণত উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ায় এসব কেন্দ্র সীমিতভাবে ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু বর্তমান সংকটে জনস্বার্থে অতিরিক্ত ব্যয় বহন করেও বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এরপরও কিছু এলাকায় লোডশেডিং এড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
তথ্য উপদেষ্টা জানান, তিনি এ বিষয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।
সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনালটি ধাপে ধাপে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু করবে।
একবারে পূর্ণ সক্ষমতায় নয়, পর্যায়ক্রমে সরবরাহ বাড়ানো হবে। এর ফলে অতিরিক্ত বিদ্যুতের চাহিদা কমবে এবং গ্যাস ও বিদ্যুৎ, উভয় সংকটই ধীরে ধীরে কেটে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, বর্তমান সংকটকে শুধু অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতাও এর অন্যতম কারণ।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপীয় দেশগুলো রাশিয়ার পাইপলাইনের গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যাপকভাবে এলএনজির দিকে ঝুঁকে পড়ে। এতে বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির চাহিদা ও দাম উভয়ই বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুটগুলোতে কোনো ধরনের সংকট সৃষ্টি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির সরবরাহ ও মূল্য উভয়ের ওপরই বড় প্রভাব পড়বে। এর প্রভাব থেকে বাংলাদেশও পুরোপুরি মুক্ত থাকতে পারবে না।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকার শুধু তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলাই নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কাজ করছে।
স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারি ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনায় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে চলছে। তবে এসব প্রকল্পের সুফল পেতে সময় লাগবে।
তিনি বলেন, অফশোর কিংবা স্থলভাগে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং সেখান থেকে উৎপাদন শুরু করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। তাই বর্তমান সংকট থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে কিছুটা সময় প্রয়োজন।
এ সময় দেশের মানুষকে ধৈর্য ধরার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকার দেশের জ্বালানি ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা, ব্যাকআপ সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে কাজ করছে।
আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এলএনজি টার্মিনালের কার্যক্রম স্বাভাবিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই বর্তমান সংকট ধাপে ধাপে কমে আসবে।