যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির পরবর্তী নেতা ও দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে আরও একধাপ এগিয়ে গেলেন অ্যান্ডি বার্নহাম। দলের সিংহভাগ আইনপ্রণেতা (এমপি) তাকে কিয়ার স্টারমারের উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছেন। প্রথম দফার মনোনয়ন গণনায় ৪০৩ জন লেবার এমপির মধ্যে ৩২২ জনই বার্নহামকে সমর্থন জানিয়েছেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীর নির্বাচনে দাঁড়ানোর পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে বার্নহামের আর মাত্র একজন এমপির সমর্থন প্রয়োজন। বর্তমানে তিনি প্রয়োজনীয় ৩২৩টি মনোনয়নের চেয়ে মাত্র একটি ভোট দূরে আছেন। এতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়া তার এখন প্রায় সময়ের ব্যাপার।
লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী বৃহস্পতিবার। আগামী শুক্রবার বার্নহামকে আনুষ্ঠানিকভাবে লেবার পার্টির নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে এবং আগামী ২০ জুলাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বার্নহাম ৩২৩টি মনোনয়নে পৌঁছে গেলে অন্য কোনও প্রার্থীর পক্ষে এই প্রতিযোগিতায় নামার আর সুযোগ থাকবে না। কারণ স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে অন্তত ৮১ জন এমপির সমর্থনের প্রয়োজন হবে, যা বাকি থাকা এমপিদের সংখ্যা অনুযায়ী আর কারও পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। লেবার পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তারা ভোট দিতে পারেননি, তবে আগামী সোমবার পার্লামেন্টে ফিরে তারা বার্নহামকেই সমর্থন দেবেন।
বুধবার রাতে সাবেক জুনিয়র প্রতিরক্ষামন্ত্রী আল কার্নস বার্নহামের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দিলে বার্নহামের নেতৃত্ব পাওয়ার পথটি কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়।
গত মে মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে দলের বিপর্যয়কর ফলাফলের পর দলটির আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব ও নীতি পরিবর্তনের জোরালো দাবি ওঠে। এর প্রেক্ষিতে গত মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার।
কয়েক সপ্তাহ আগে মেকারফিল্ড উপ-নির্বাচনে জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে আসা ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র বার্নহামের জন্য এটি একটি অসাধারণ রাজনৈতিক উত্থান। এক বিবৃতিতে বার্নহাম তার ওপর আস্থা রাখার জন্য লেবার এমপিদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, দলের সব স্তরের মানুষের কাছ থেকে আসা এই সমর্থন প্রমাণ করে যে ব্রিটেনের রাজনীতিতে এখন একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ওয়েস্টমিনস্টার থেকে সরিয়ে সাধারণ মানুষের হাতে দেওয়া এবং প্রতিটি অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
গত মে মাসে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয় এবং বার্নহামের উপ-নির্বাচনে জয়ের পর কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দলের ভেতর থেকেই তাকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। অবশেষে বার্নহাম এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার দিনই স্টারমার লেবার পার্টির নেতৃত্ব থেকে পদত্যাগ করেন।
নতুন নেতৃত্ব প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রার্থীদের আগামী সপ্তাহের বুধবারের মধ্যে অন্তত ৮১ জন এমপির সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। বার্নহাম ৩২৩ জন এমপির সমর্থন পেয়ে গেলে অন্য কারও পক্ষে এই কোটা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এছাড়া লেবার পার্টির সঙ্গে যুক্ত ৩১টি সমাজতান্ত্রিক সমাজ ও ট্রেড ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত তিনটির মনোনয়ন পেতে হবে তাকে, যা কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র বলেই মনে করা হচ্ছে।
কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় ২০১০ ও ২০১৫ সালের নেতৃত্ব নির্বাচনে ব্যর্থ হওয়া বার্নহাম এবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ডাউনিং স্ট্রিটে পা রাখতে যাচ্ছেন। সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আল কার্নস এই দৌড় থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ায় বার্নহামের পথ আরও মসৃণ হয়।
তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় দলের ভেতর থেকেই অনেকে তার ভবিষ্যৎ নীতি ও পরিকল্পনা বিস্তারিত প্রকাশের দাবি তুলেছেন। ২০১৭ সালে ওয়েস্টমিনস্টার ছাড়ার পর দীর্ঘ বিরতির কারণে বর্তমানের নতুন এমপিদের অনেকের সাথেই তার গভীর সংযোগ নেই, যা তার জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। আগামী সোমবার (১৩ জুলাই) এমপিদের মুখোমুখি হয়ে তিনি নিজের পরিকল্পনা প্রকাশ করবেন বলে জানা গেছে।
এদিকে বার্নহাম ইতোমধ্যেই তার ভবিষ্যৎ সরকারের কিছু রূপরেখা দিয়েছেন। ম্যানচেস্টারে একটি নতুন ‘নম্বর ১০’ ইউনিট খোলার প্রস্তাব করেছেন, যা আবাসন ও পরিবহনের মতো খাতে স্থানীয় সরকারকে আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ দেবে। পাশাপাশি পানি ও জ্বালানি খাতকে জনগণের নিয়ন্ত্রণে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে, গাজা যুদ্ধ নিয়ে লেবার পার্টির প্রাথমিক অবস্থানের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন বার্নহাম। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা খাতে টেকসই বিনিয়োগ বৃদ্ধির আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও বার্নহামের প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি একজন দক্ষ প্রধানমন্ত্রী হবেন।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স