ইরানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তি নিয়ে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার কঠোর সমালোচনার জবাবে নজিরবিহীন হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ইসরায়েলকে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেছেন, বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র বন্ধু অবশিষ্ট রয়েছে এবং কেবল ‘হত্যা’ বা সামরিক শক্তি দিয়ে সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থী সদস্যদের আক্রমণাত্মক মন্তব্যের জবাবে ভ্যান্স স্পষ্ট করে বলেন, হোয়াইট হাউসের এই শান্তিচুক্তির বিরোধিতা করে তারা মূলত নিজেদের একমাত্র শক্তিশালী মিত্রকেই অপমান করছে। একইসঙ্গে লেবাননে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর বোমা হামলা চালিয়ে ইসরাইল শান্তি আলোচনা নস্যাৎ করছে বলেও তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন।
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত এই ‘সহযোগিতা স্মারক’ বা চুক্তিটি নিয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং তার মন্ত্রিসভার অনেক সদস্য পর্দার আড়ালে চরম ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে উগ্র ডানপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির ও বেজালেল স্মোট্রিচ এই চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছেন। এর জবাবে নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স বলেন, ৯ মিলিয়নের একটি দেশ কেবল যুদ্ধের মাধ্যমে টিকে থাকতে পারে না। গত তিন মাসে ইসরাইলের প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত দুই-তৃতীয়াংশ অস্ত্রই মার্কিন করদাতাদের টাকায় তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি ইসরাইলকে ‘বাস্তবতার ঘ্রাণ’ নেওয়ার পরামর্শ দেন। অবশ্য বেন-গ্যভিরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টা জবাবে বলেছেন, একবিংশ শতাব্দীর নাজিদের (ইরান) সঙ্গে ঠিক সেভাবেই মোকাবিলা করতে হবে যেভাবে বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র আসল নাজিদের দমন করেছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরানের প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের ফ্রিজড বা অবরুদ্ধ তহবিল ছেড়ে দেওয়া, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা এবং দেশটির তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বড় বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে তাদের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে রাজি হয়েছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম গত মার্চের পর প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের নিচে নেমে এসেছে। তবে এই চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর তাৎক্ষণিক কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় খোদ ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সাবেক মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এটিকে ইরানের কাছে ‘আত্মসমর্পণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ইসরাইলের অভ্যন্তরেও এই চুক্তিকে একটি ‘বিপর্যয়’ এবং ‘মারাত্মক আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশটির গণমাধ্যমগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে। অন্যদিকে, গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়া ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, নিরুপায় হয়েই ট্রাম্প এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন এবং ভবিষ্যৎ আলোচনায় ইরান শত্রুর কোনো শর্ত মেনে নেবে না। তবে মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স মনে করছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে, যা তিনি এখন মার্কিন ভোটারদের কাছেও প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ