1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
রবিবার, ০৭ জুন ২০২৬, ১১:৪৯ অপরাহ্ন

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে কমবে রপ্তানি সক্ষমতা

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ৭ জুন, ২০২৬
  • ১৪ Time View

বৈশ্বিক বাজারে ক্রেতাদের মূল্যচাপ, কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং দেশের ভেতরে জ্বালানিসংকটের মধ্যে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন শিল্পোদ্যোক্তারা। তাঁদের আশঙ্কা, উৎপাদন ব্যয় আরো বেড়ে গেলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমবে, নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্প খাত বড় ধরনের চাপে পড়বে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা বলছেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত না করেই মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এমনিতেই লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজের কারণে কারখানাগুলোকে ব্যয়বহুল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ আরো বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে তৈরি পোশাক, ইস্পাত, সিমেন্টসহ প্রায় সব শিল্প খাতে।

দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, কালুরঘাট, নাসিরাবাদ ও বায়েজিদ বোস্তামী শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত।

কয়েক বছর ধরে ডলারসংকট, এলসি খোলায় কড়াকড়ি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এমনিতেই উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিল। এর ওপর গত কয়েক মাসে অভ্যন্তরীণ বাজারে পরিবহন খরচ এবং অন্যান্য সেবামূলক খাতের ব্যয় কয়েক গুণ বেড়েছে।

শিল্পমালিকরা বলছেন, আয় বা মুনাফার মার্জিন না বাড়লেও প্রতিনিয়ত উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে কারখানা চালু রাখাই যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্পের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল।

তাঁদের মতে, বিদ্যুৎ একটি মৌলিক উৎপাদন উপকরণ। এর দাম বাড়লে সুতা কাটা থেকে শুরু করে পোশাক তৈরি, রড, সিমেন্ট, ভারী ধাতু, রাসায়নিকসহ সব ধরনের শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় ক্ষোভের জায়গা হলো, টাকা দিয়েও মিলছে না মানসম্মত ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। লোডশেডিং ও লো ভোল্টেজের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদনসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভারী শিল্পগুলোতে বিদ্যুৎ চলে গেলে ফার্নেস বা স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন লাইনের যে ক্ষতি হয়, তা কাটিয়ে উঠতে লাখ লাখ টাকা অপচয় হয়।

ব্যয়বহুল জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছেন উদ্যোক্তারা। এতে ডিজেলের পেছনে বিপুল পরিমাণ বাড়তি অর্থ ব্যয় হচ্ছে। প্রিমিয়ার সিমেন্টের মহাব্যবস্থাপক গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা এখন কারখানায় বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে পারছি না। বাধ্য হয়ে চড়া দামে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। এই সংকটের মধ্যে সরকার যদি আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, তবে তা হবে গোদের ওপর বিষফোড়া।’

দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত তৈরি পোশাক শিল্প (আরএমজি) বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বৈশ্বিক বাজারে মুদ্রাস্ফীতির কারণে পশ্চিমা ক্রেতারা পোশাকের ব্যবহার ও কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা যেমন কমেছে, তেমনি বিদেশি ক্রেতারা প্রতিনিয়ত পণ্যের দাম কমানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার ও দাম কমছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। এই দুই বিপরীতমুখী চাপের কারণে তৈরি পোশাক খাত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। নানামুখী খরচের এই বোঝার ওপর নতুন করে বিদ্যুতের বাড়তি দাম বহনের সক্ষমতা এই খাতের আর নেই।

তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর সহসভাপতি রফিক চৌধুরী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে বায়াররা পোশাকের দাম কমিয়ে দিচ্ছে। আর আমাদের দেশে জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সবকিছুই একসঙ্গে বাড়ছে। এই অবস্থায় বিশ্ববাজারে টিকে থাকাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

একই সুরে কথা বলেছেন ক্লিফটন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দেশে বিদ্যুৎ বা গ্যাসের দাম বাড়ল কি না, তা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তারা বাড়তি দাম দেয় না। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার পুরো চাপ উদ্যোক্তাদেরই বহন করতে হয়।’

অর্থনৈতিক সংকটের ছোঁয়া লেগেছে দেশের ভারী শিল্প ও নির্মাণ খাতেও। বিশেষ করে রড, সিমেন্ট ও ইস্পাতশিল্পের বাজার দীর্ঘদিন ধরে স্থবির। ডলার সংকটের কারণে কাঁচামাল ও স্ক্র্যাপ লোহা আমদানির খরচ বেড়েছে। এর ওপর ভারী শিল্পগুলোতে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। ফলে নতুন মূল্যহার এই খাতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিয়েছে।

ইস্পাত খাতের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ) এরই মধ্যে বিদ্যুতের বাড়তি মূল্যহার প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটির মতে, আবাসন ও অবকাঠামো খাতের স্থবিরতার কারণে রড-সিমেন্টের বিক্রি কমে গেছে। এ অবস্থায় বিদ্যুতের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়বে। ফলে নির্মাণসামগ্রীর দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে এবং সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চট্টগ্রাম চেম্বার ও স্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বিনিয়োগ আকর্ষণের অন্যতম শর্ত হলো সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ। কিন্তু দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম যেমন বাড়ছে, তেমনি পর্যাপ্ত সরবরাহও মিলছে না। এতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা মনে করেন, শিল্প খাত সচল রাখতে সরকারকে ভর্তুকি ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। শুধু রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে বারবার বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে তা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে।

চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তারা বিদ্যুতের বর্ধিত মূল্যহার পুনর্বিবেচনা বা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, কর্মসংস্থান রক্ষা, শিল্পায়নের গতি ধরে রাখা এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন অব্যাহত রাখতে রপ্তানিমুখী ও ভারী শিল্প খাতের জন্য সহনীয় বিদ্যুত্মূল্য নিশ্চিত করা জরুরি।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৫ প্রিয়দেশ