জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে একটি ‘নিউ অর্ডার’ বা নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে সংবিধান মানতে বাধ্য নই বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
শনিবার (২৫ এপ্রিল) ‘জুলাই চার্টার এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সাংবিধানিক ব্যবস্থা’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন। রাজধানীর গ্রিনরোডে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের অডিটরিয়ামে এ আয়োজন করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে ‘বিপ্লব’ হিসেবে উল্লেখ করে বদিউল আলম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করেন যে এটা বিপ্লব কি না? সংজ্ঞা অনুযায়ী এটা বিপ্লব। কেননা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান একটি সফল আন্দোলন। তবে যেটা সফল না হয়, সেটা বিদ্রোহ। জুলাইয়ে যেটা ঘটেছে, সেটা বিপ্লব। কারণ এটা সফল হয়েছে।
তিনি বলেন, বিপ্লব সফল হলে ‘ওল্ড অর্ডার ইজ গন অ্যান্ড রুল ফর নিউ অর্ডার’। অর্থাৎ আগের শাসনব্যবস্থা, নিয়ম-কানুন বা ক্ষমতার কাঠামো অকার্যকর হয়ে যায়। একইসঙ্গে তৈরি হয় নতুন কাঠামো বা বাস্তবতা। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের সংবিধান বাতিল করা হয়নি। তাই আমরা যে সংবিধান ব্যবহার করছি, তার যেন ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়। কিন্তু আমরা সংবিধান মানতে বাধ্য নই। কারণ ইটস এ নিউ অর্ডার। কেননা একটা বিপ্লব হয়েছে।
সুজন সম্পাদক বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী ছাত্রদের তিনটা দাবি ছিল। এসব হলো বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন। এর পরিপ্রেক্ষিতে জরিপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে নাগরিক সমাজ ও সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জুলাই সনদ করা হয়েছিল।
দীর্ঘ আলোচনার প্রক্রিয়ায় ৮৪টি বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যমত সৃষ্টি হয়েছিল জানিয়ে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সব বিষয়ে সবার একমত হওয়া সম্ভব নয়, ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত থাকতেই পারে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ প্রায় ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি দলই ৮৪টি বিষয়ে একমত হয়েছে, যা গণতান্ত্রিকভাবেই গ্রহণযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, ঐকমত্যে আসা ৮৪টি বিষয়ের মধ্যে ৪৮টি ছিল সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত। বাকি ৩৬টি আইন, অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য। এছাড়া জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। এটিকে সংবিধানের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেছে তারা।
বদিউল আলম বলেন, সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৪৮টি বিষয়ের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার নিজেদের মতামত দিয়েছেন। জনগণের এই মতামতই সংবিধানের মূল ভিত্তি। অর্থাৎ জনগণের অভিপ্রায়ের প্রতিফলন। সংবিধানে এসব প্রক্রিয়ার সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও জনগণের ইচ্ছা ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এসব বৈধতা পায় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিক বলেন, সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘমেয়াদি পরামর্শভিত্তিক ছিল। আট মাস ধরে ৩০টির বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মাধ্যমেও রাজনৈতিক দল, সিভিল সোসাইটি, বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, শুধু সংস্কার প্রস্তাব নয়, সেগুলো বাস্তবায়নের উপায় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে সব বিষয়ে পূর্ণ ঐকমত্য না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত জনগণের রায়ের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যার ফলশ্রুতিতে গণভোটের উদ্যোগ আসে। আর এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল। ফলে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার সমর্থন দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট আদেশ সাধারণ আইনের চেয়েও বেশি বৈধতা পেয়েছে।
সেমিনারে আরও বক্তব্য রাখেন আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি এমএ মতিন, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আবু হেনা রাজ্জাকীসহ আরও অনেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীরাও এতে অংশ নেন।