গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে বাল্যবিয়ে , মাদক সেবন – কারবার ও অনলাইন জুয়া। এই তিন সামাজিক ‘ ব্যাধি ’ র নিরাময়ে গ্রাম আদালতকে আরও শক্তিশালী করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ দফাদার ’ ও ‘ মহল্লাদার ’ দের পদবি পরিবর্তন করে ‘ গ্রাম পুলিশ ’ করা হচ্ছে। সরকারের অন্যান্য বাহিনীর মতো তাদের জন্যও বানানো হচ্ছে নির্দিষ্ট ‘ লোগো ’ । বাড়ানো হবে বেতন এবং আনুতোষিক ভাতাও। পাশাপাশি প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে নিয়োগ দেওয়া হবে আরও দুজন করে মোট ৯ হাজার ১৭৬ জন নারী মহল্লাদার – দফাদার ( গ্রাম পুলিশ ) । এ ছাড়া শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মডেল ‘ গ্রাম সরকার ’ ব্যবস্থাকেও দীর্ঘদিন পর ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে গ্রামের সব ধরনের সমস্যা বা সংকট গ্রামেই সমাধানের চিন্তা করছে সরকার। আগামী ৭ নভেম্বর রাজধানীর তেজগাঁওয়ের জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে অনুষ্ঠেয় গ্রাম পুলিশ মহাসমাবেশে এসব বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে মিলেছে এমনই আভাস। জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম আগামীর সময়কে বললেন , ‘ আগামী ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে রাজধানীতে গ্রাম পুলিশদের মহাসমাবেশ হচ্ছে। এতে সারা দেশ থেকে প্রায় ৫০ হাজার গ্রাম পুলিশ অংশ নেবেন। সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিশেষ অতিথি থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভাপতিত্ব করবেন স্থানীয় সরকার , পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ড . আবদুল মঈন খান। সেখানে সরকারপ্রধান গ্রাম পুলিশদের কথা শুনবেন। তারা নতুন কোনো দাবি তুলে ধরলে সেগুলোও বিবেচনা করা হতে পারে। তাদের দাবি – দাওয়া শুনে যতদূর সম্ভব সরকারের সামর্থ্যের মধ্যে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা আসতে পারে। ’ জানা গেছে , একটি ইউনিয়ন পরিষদে সাধারণত ১০ জন গ্রাম পুলিশ ( ১ জন দফাদার ও ৯ জন মহল্লাদার ) থাকেন। মহল্লাদারদের দলনেতা হিসেবে কাজ করেন দফাদার। গ্রামাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা , গ্রাম ও মহল্লায় প্রহরার ব্যবস্থা এবং অপরাধ দমনে পুলিশকে সহায়তা করাই তাদের কাজ। সেই হিসাবে দেশে ৪ হাজার ৫৮৮টি ইউনিয়ন পরিষদে ৪৫ হাজার ৮৮০ জন গ্রাম পুলিশ রয়েছেন। গত বছরের জুলাইয়ে দফাদারদের বেতন – ভাতা ৭ হাজার টাকার পরিবর্তে ৮ হাজার টাকা ও মহল্লাদারদের বেতন – ভাতা ৬ হাজার ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। এ ছাড়া দফাদারদের অবসরকালীন বা মৃত্যুকালীন ( আনুতোষিক ) ভাতা ৬০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৮০ হাজার ও মহল্লাদারদের ৫০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৭০ হাজার ) টাকা ( সরকারি এবং ইউনিয়ন পরিষদ অংশে ৫০ : ৫০ হারে ) করা হয়। এর আগে ২০১৬ সাল থেকে ৬ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পেতেন তারা। এরপর জিনিসপত্রের দাম বাড়লেও বাড়েনি তাদের বেতন। তারও আগে গ্রাম পুলিশ বেতন পেতেন ৩ হাজার ৫০০ টাকা। ২০০৯ সালে তাদের বেতন ছিল ১ হাজার ৪০০ টাকা। মাসের পর মাস অপেক্ষার পর বেতন তুলতে পারেন তারা। মাসিক বেতন ছাড়া তারা অন্যান্য সুযোগের মধ্যে শুধু মাত্র দুটি ঈদে বেতনের সমপরিমাণ টাকা বোনাস পান তারা। এ ছাড়া আর কোনো সুযোগ – সুবিধা নেই। এই স্বল্প বেতনে চলে তাদের জীবন – সংসার। দ্রব্যেমূল্যের আকাশচুম্বী ঊর্ধ্বগতির কারণে পরিবার – পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন গ্রাম পুলিশরা। ইউনিয়নের কোথাও সমস্যা দেখা দিলে সেখানেই ছুটে যান তারা। গ্রাম পুলিশরা ইউপি সচিবকে জন্ম – মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করে প্রদান , ইউপি ভবন ও বিভিন্ন সড়কে রাতে দায়িত্বপালন , গ্রাম আদালত , গ্রামে কোনো সংস্থার কর্মসূচি চলাকালীন ও সড়ক দুর্ঘটনার স্থানে তাৎক্ষণিক দায়িত্ব পালন , উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বাল্যবিয়ে – সংক্রান্ত তথ্য প্রদান , অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর সংবাদ থানায় জানানো , মাদকদ্রব্য ও জুয়া প্রতিরোধে অভিযান চালানোয় সহযোগিতাসহ অগণিত দায়িত্ব পালন করে থাকেন গ্রাম পুলিশ সদস্যরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় সরকার বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানালেন , গ্রাম পুলিশদের বেতন ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা বাড়ানো হতে পারে। পাশাপাশি অবসরকালীন বা মৃত্যুকালীন ( আনুতোষিক ) ভাতা ৮০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা করার ঘোষণা আসতে পারে। এ ছাড়া নারী অপরাধীদের ধরতে প্রতি ইউনিয়নে দুজন করে নারী গ্রাম পুলিশ নিয়োগ দিতে এ – সংক্রান্ত প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি লোগো তৈরি করতে সম্প্রতি কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। দফাদার ও মহল্লাদার পদবি পরিবর্তন করে ‘ গ্রাম পুলিশ ’ করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। গ্রাম পুলিশদের নিয়োগ জেলা প্রশাসকদের ( ডিসি ) মাধ্যমে করারও চিন্তাভাবনা চলছে। কারণ বর্তমানে ইউএনওর নেতৃত্বে একটি নিয়োগ কমিটি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে গ্রাম পুলিশদের নিয়োগের পুরো ক্ষমতা ইউপি চেয়ারম্যানের হাতে। অভিযোগ আছে , চেয়ারম্যানদের অনেকে টাকা নিয়ে অস্থায়ী নিয়োগ দিয়ে কাজ করান। পরে ইউএনওকে ম্যানেজ করে তাদের নিয়োগ স্থায়ী করেন। এতে চেয়ারম্যানের অন্যায় আবদারও সহ্য করতে হয় গ্রাম পুলিশদের। এ ছাড়া গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাল্যবিয়ে , মাদক সেবন – কারবার ও অনলাইন জুয়া মহামারী আকার ধারণ করেছে। এসব অপরাধ ঠেকাতে গ্রাম পুলিশদের প্রশিক্ষণ দিয়ে গ্রামের সমস্যা গ্রামেই সমাধান করতে চায় সরকার। এরই অংশ হিসেবে গ্রাম আদালত ও গ্রাম সরকার শক্তিশালী করার নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কমান্ডার এম এম লাল মিয়া আগামীর সময়কে বললেন , ‘ আমরা জাতীয় বেতন স্কেলে ২০তম গ্রেডে বেতনভুক্ত কর্মচারী। ২০১১ সালে এ বিষয়ের গেজেট আছে। কিন্তু সরকার বেতন না দেওয়ায় আমরা আদালতে রিট করি। রায় আমাদের পক্ষে হলেও সরকার আপিল করেছে , যা এখনো চলমান। আমরা চাই গেজেট অনুযায়ী বেতন – ভাতা। এ ছাড়া আমাদের আইনি ক্ষমতা বাড়াতে হবে। আমরা অপরাধীদের নিয়ে কাজ করি , কিন্তু তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা নেই। অথচ পুলিশ সদস্যদের মতো আমরা সব ধরনের অপরাধী নিয়ে কাজ করি। আমাদের জীবনের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। ’ ‘ চেয়ারম্যান – মেম্বারদের লাথি – গুঁতা সহ্য করে চাকরি করতে হয়। আমাদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা দিতে হবে ’— যোগ করলেন গ্রাম পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি।