রংপুর: রংপুর আদালত চত্বরের ১০ তলা মেট্রোপলিটান ও জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ভবনে অন্তত ৩০টি আদালত থাকলেও লিফট মাত্র দুটি। এ দুটির মধ্যে একটি শুধু আইনজীবীদের জন্য বরাদ্দ। ফলে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই হাজার বিচারপ্রার্থীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বৃদ্ধ, অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা লিফটে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করছেন। বারবার আবেদন করেও নতুন লিফট সংযোজনের কোনো উদ্যোগ নেই।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, ভবনটিতে চরম বিশৃঙ্খলা ও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। বদরগঞ্জ থেকে শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে আসা ৮৫ বছর বয়সী মমতাজ উদ্দিন লাঠিতে ভর দিয়ে এসেও লিফটে জায়গা পাননি। তাকে সিঁড়ি বেয়ে ৫ তলায় উঠে হাজিরা দিতে হয়। হাজিরা শেষে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করেও লিফট না পেয়ে আবার সিঁড়ি বেয়েই নিচে নামতে হয়। তিনি বলেন, ‘সাড়ে ১০টায় এসে ১১টায় শুনানি ছিল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও লিফটে জায়গা মেলেনি। বাধ্য হয়ে অনেক কষ্টে ৫ তলায় উঠলাম, বয়স ও অসুস্থতার কারণে সারা শরীর কাঁপছিল।’
একই ভোগান্তির শিকার শারীরিক প্রতিবন্ধী আলেমা বেগম। তার বিচারক বসেন ৭ তলায়। একবার কোনোমতে উপরে উঠলেও শুনানি শেষে প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে হয়েছে তাকে।
জানা গেছে, এই ১০ তলা ভবনে রংপুরের ৮ উপজেলার বিভিন্ন আদালত ছাড়াও মেট্রোপলিটন আদালত, মহানগর দায়রা জজ আদালত, বিদ্যুৎ আদালত ও সাইবার ট্রাইব্যুনালসহ অন্তত ৩০টি আদালত রয়েছে। প্রতিদিন এখানে অন্তত দেড় থেকে দুই হাজার বিচারপ্রার্থীর সমাগম ঘটে। অথচ যাতায়াতের ভরসা মাত্র দুটি লিফট, যার একটি আইনজীবীদের জন্য সংরক্ষিত। মাঝেমধ্যেই লিফট দুটি বিকল হয়ে পড়ে। লিফটে উঠতে রীতিমতো মল্লযুদ্ধ করতে হয়। জায়গা না পেয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর থাকে না।
শুধু বিচারপ্রার্থীরা নন, একই ভোগান্তির শিকার আইনজীবীরাও। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী বায়েজীদ ওসমানী জানান, বিদ্যুৎ আদালতে ১০ তলায় মামলা ছিল। লিফটের সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও জায়গা পাননি। বিচারক আসনে বসে যাওয়ায় তড়িঘড়ি করে হেঁটেই তাকে উপরে উঠতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমি বয়স্ক মানুষ। ১০ তলায় সুস্থ মানুষও এভাবে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতে পারবেন না।’
আইনজীবী আফসানা শারমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘১০ তলা এই ভবনে ৩০ জনের বেশি বিচারক বিচারকাজ পরিচালনা করেন। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করলেও ভবনটি নির্মাণের সময় অপরিকল্পিত নকশা করা হয়েছে। যেখানে অন্তত ছয়টি বড় আকারের লিফট দরকার, সেখানে মাত্র দুটি ছোট লিফট দিয়ে এত মানুষের চলাচল অসম্ভব। বিষয়টি বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি।’
রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন বলেন, ‘আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের এই ১০ তলা ভবনে যাতায়াত করা এখন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। দুটি ছোট লিফটের একটি প্রায় সময় অচল থাকে। পুরো বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।’
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, ভবন চালু হওয়ার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই লিফট বিকল হতে শুরু করে। কোনোভাবে মেরামত করা হলেও কিছুদিন পরেই আবার সমস্যা দেখা দেয়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লিফট সংকটের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে, যার ফলে প্রতিদিন হাজারো মানুষকে অসহনীয় দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে আদালত সেবা নিতে হচ্ছে।