অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক শেষে বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে ঘাটতি বেড়েছে ৬৬ শতাংশ, যেটিকে উদ্বেগজনক বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্য বা ব্যালেন্স অব পেমেন্টে (বিওপি) বড় ধরনের ঘাটতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জুলাই-সেপ্টেম্বর) শেষে ১৩৩ কোটি ২০ লাখ ডলারের ঘাটতি দেখা দিয়েছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬৬ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর শেষে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮২ কোটি ১০ লাখ ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংক বৃহস্পতিবার বৈদেশিক লেনদেনের চলতি হিসাবের ভারসাম্যের তথ্য প্রকাশ করেছে, যা দেখে এটিকে উদ্বেগজনক বলছেন অর্থনীতিবিদরা।
তারা বলছেন, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে ওলটপালট হয়ে যাওয়া বিশ্ব পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলোতে এই ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।
প্রথম প্রান্তিক শেষে বড় ঘাটতি দেখা গেলেও ২০২৬-২৭ অর্থবছর শুরু হয়েছিল উদ্বৃত্ত দিয়েই। অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এই সূচকে ৬ কোটি ৪০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। জুলাই-অগাস্ট শেষে উদ্বৃত্ত বেড়ে দাঁড়ায় ৫৯ কোটি ৯০ লাখ ডলারে। তবে পরের মাস শেষে দেখা দিল বড় ঘাটতি।
বিশ্ব ব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিন মাসে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ১ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ঘাটতি মানেই অর্থনীতি স্বস্তিতে নেই। রেমিটেন্স ও রপ্তানি আয় ইতিবাচক ধারায় থাকলেও বিদেশি ঋণ কিন্তু বেশ কমেছে। মূলত এ কারণেই ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
“সার্বিক বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অর্থনীতির সংকট কাটাতে কম সুদের বিদেশি ঋণ পাওয়ার দিকেই এখন সরকারের সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া উচিৎ। আইএমএফের ঋণ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। সেটা যাতে দ্রুত পাওয়া যায় সেই চেষ্টা করতে হবে। অন্যদিকে বিশ্ব ব্যাংক, এডিবিসহ অন্য দাতা দেশ ও সংস্থার ঋণের দিকেও নজর দিতে হবে।”
নিয়মিত আমদানি-রপ্তানিসহ অন্যান্য আয়-ব্যয় চলতি হিসাবের অন্তর্ভুক্ত। এই হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকার অর্থ হল, নিয়মিত লেনদেনে দেশকে কোনো ঋণ করতে হচ্ছে না। আর ঘাটতি থাকলে সরকারকে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৪৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ বেশি।
গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৭১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ১ হাজার ৯৩৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা। এ অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ দশমিক ১০ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই তিন মাসে ১ হাজার ৬৮০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল।
এর বিপরীতে চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে পণ্য রপ্তানি থেকে ১ হাজার ১৮৫ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় করেছেন রপ্তানিকারকরা, যা আগের গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ শতাংশ বেশি।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই তিন মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে ১ হাজার ১০৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় হয়েছিল।
এ হিসাবে জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে পণ্য বাণিজ্যে সার্বিক ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।
ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি থাকলেও আর্থিক হিসাবে (ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্ট) কিছুটা উদ্বৃত্ত রয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই সূচকে ৩২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে।
গত অর্থবছরের একই সময়ে এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল অনেক বেশি, ১৭৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। তার আগে ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছর শেষে আর্থিক হিসাবে উদ্বৃত্তের পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন ডলার।
সামগ্রিক লেনদেনে ঘাটতি ১১৬ কোটি ডলার
সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্যেও (ওভারঅল ব্যালেন্স) বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। জুলাই-সেপ্টেম্বরে এই ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
৬৬০ কোটি ডলারের বড় উদ্বৃত্ত নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৫-২৬ অর্থবছর। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৩৩৯ কোটি ৩০ লাখ ডলারের উদ্বৃত্ত নিয়ে। আর ৪৩০ কোটি ডলারের ঘাটতি নিয়ে শেষ হয়েছিল ২০২৩-২৪ অর্থবছর।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে ৩৫ কোটি ৩০ লাখ ডলারের নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) পেয়েছে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ কম।
২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের এই তিন মাসে ৩৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের এফডিআই এসেছিল দেশে। পুরো অর্থবছরে ১৪৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারের নিট এফডিআই এসেছিল, যা ছিল তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫ শতাংশ কম।
মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ অর্ধেকে নেমেছে
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থার কাছ থেকে ৫৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ (এমএলটি ঋণ) পেয়েছে বাংলাদেশ। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় অর্ধেক।
গত অর্থবছরের এই তিন মাসে ১০৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ পেয়েছিল বাংলাদেশ।
মসনদে টান ওদের, দমবন্ধ কিন্তু আমাদেরই
ল্যাবে কি ঘুমিয়ে আছে পূর্ণ শিক্ষিত রোবট?
পশুপাখির প্রতি নিষ্ঠুরতা: নিজের পায়ে কুড়াল মারার দীর্ঘ ইতিহাস