পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেছেন, গণপরিবহণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ ও নগর চলাচল ব্যবস্থা আরও উন্নত করতে ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকায় আরও মেট্রোরেল নির্মাণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য বড় শহরেও মেট্রোরেল সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) একনেকের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সভাপতিত্বে বাংলাদেশ সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একনেক সভা শেষে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। এ সময় পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার উপস্থিত ছিলেন।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, নগরায়ন দ্রুত বাড়ছে এবং আধুনিক গণপরিবহণের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরেও পর্যায়ক্রমে মেট্রোরেল সেবা সম্প্রসারণের প্রয়োজন রয়েছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। এখন মেট্রোরেল নির্মাণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক ও কারিগরি সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা একটি মেট্রোরেল নির্মাণ করেছি, ট্রেন চলছে এবং মানুষ এর সুফল ভোগ করছে। এখন মেট্রোরেল নির্মাণের বিভিন্ন কাজে অংশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা আমাদের নিজেদের তৈরি করতে হবে।
ভবিষ্যৎ প্রকল্পে প্রযুক্তি হস্তান্তরকে গুরুত্ব দেওয়া হবে জানিয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, এর মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিদেশি কারিগরি দক্ষতার ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।
মেট্রোরেল-৫-এর সাউদার্ন রুটের ব্যয় অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় বেশি হওয়ার বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পের আওতা, ভূগর্ভস্থ নির্মাণ, বিস্তারিত নকশা, অর্থায়নের শর্ত, বিনিময় হার, মূল্যস্ফীতি ও করসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্প ব্যয়ে পার্থক্য হয়।
জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় প্রস্তাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। তবে পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে একনেকে উপস্থাপনের আগে ব্যয় কমিয়েছে। এ ছাড়া একটি কারিগরি কমিটিও প্রকল্পের ব্যয় ও অর্থায়নসংক্রান্ত বিষয় বিস্তারিত পর্যালোচনা করেছে।
প্রকল্পটির জন্য উচ্চ ব্যয়ে কোনো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে নিয়োগ পেয়েছে এমন অভিযোগের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো পরামর্শক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, প্রকল্পটি কেবল অনুমোদিত হয়েছে। অনুমোদনের পর নিয়োগ প্রক্রিয়া হবে, এরপর দরপত্রের নথি প্রস্তুত করা হবে এবং পরবর্তীতে ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেওয়া হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা কার্যাদেশ না হওয়া পর্যন্ত অতিরিক্ত পরামর্শক ব্যয়ের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয় বলেও প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) অর্থায়নের সুদের হার বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, জাপানের অর্থায়নে নেওয়া প্রকল্পগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বের কারণে অর্থায়নের শর্তে পরিবর্তন এসেছে। তিনি বলেন, আগে সুদের হার প্রায় শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ বিবেচনা করা হলেও তা বেড়ে প্রায় ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনে আরও বিলম্ব হলে জাইকা সুদের হার পুনরায় পরিবর্তন করতে পারে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতীয় স্বার্থে সরকার যতটা সম্ভব দর-কষাকষি করেছে।
একনেকে প্রকল্প উপস্থাপনের ক্ষেত্রে কোনো আন্তর্জাতিক চাপ ছিল না উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি আরও বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের নির্ধারিত যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই প্রকল্পগুলো একনেকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, কিছু প্রকল্প একসঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে, কারণ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চুক্তি না হলে অর্থায়নের শর্ত পরিবর্তিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
চলমান কিছু মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রাথমিক সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় অনেক সময় প্রাথমিক হিসাবের ওপর ভিত্তি করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। পরবর্তীতে বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় অতিরিক্ত প্রয়োজনীয়তা ও কাজের পরিধিতে পরিবর্তন ধরা পড়ে। এতে প্রকল্প ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
ভূগর্ভস্থ স্টেশন আরও গভীরে নির্মাণ, অতিরিক্ত অবকাঠামো এবং কাজের পরিধি পরিবর্তনের কারণে ব্যয় বাড়তে পারে উলেখ করে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের ব্যয় বৃদ্ধি ঠেকাতে সরকার প্রকল্প প্রস্তুত প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করছে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, প্রকল্প প্রস্তুতির পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে এবং অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করে এমন ঘাটতিগুলো বন্ধ করতে হবে।
বড় প্রকল্প অনুমোদনের আগে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা ও ব্যয় প্রাক্কলনের যাচাই-বাছাই আরও জোরদার করতে প্রকল্প বাস্তবায়নসংক্রান্ত নির্দেশিকা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
পরামর্শক ব্যয়ের বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা থাকা সরকারি সংস্থাগুলোকে সংশ্লিষ্ট কাজ করার সুযোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশনা দিয়েছেন, যাতে আলাদা করে পরামর্শক খাতে অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন না হয়।
এ ছাড়া সভা-সংক্রান্ত সম্মানী ও অন্যান্য প্রকল্প ব্যয় পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বিদ্যমান মেট্রোরেল অবকাঠামোর মান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে জোনায়েদ সাকি বলেন, ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যা পরীক্ষা করে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি বা দুর্নীতির কারণে কোনো দুর্বলতা সৃষ্টি হয়ে থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
ভবিষ্যতের মেট্রোরেল চুক্তিতে নির্মাণের মান, রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোকে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে বলেও জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
ভূগর্ভস্থ অংশের ক্ষেত্রে টানেলের ওপরের স্থাপনায় কোনো ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানকে তা মেরামত ও প্রয়োজন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা চুক্তিতে রাখার কথাও জানান জোনায়েদ সাকি।
এ ছাড়া যেখানে সম্ভব সরকারি অবকাঠামো প্রকল্পে সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।
জোনায়েদ সাকি বলেন, সরকারের বৃহত্তর লক্ষ্য হলো সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করা। এর মধ্যে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা, ভ্রমণ সময় কমানো, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সরকারি অর্থের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা অন্যতম।