দীর্ঘ ১৭ বছরে স্বাস্থ্যসেবা খাতে যে অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, তা দুই-এক মাসের মধ্যে দূর করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
ফরিদপুরের সমরিতা হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর প্রসূতি কনিকা মণ্ডলের পেটে সার্জিক্যাল গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগে মৃত্যুর ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দায়ী চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টায় রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে নিহত কনিকা মণ্ডলের স্বামী অশান্ত মণ্ডলের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, ফরিদপুরে সিজারিয়ান অপারেশনের পর একজন প্রসূতির পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অপারেশনের প্রায় ৫১ দিন পর তার মৃত্যু হয়েছে। এমন ঘটনায় সরকার ব্যথিত। বিষয়টি জানার পর আমি ঢাকা থেকে রাজবাড়ীতে ছুটে এসেছি। রাজবাড়ীর সিভিল সার্জনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরে স্বাস্থ্যসেবা খাতে যে অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, সেটি দুই-এক মাসে ঠিক করা সম্ভব নয়। এ সময়ে বিভিন্ন স্থানে ব্যাঙের ছাতার মতো হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। এগুলো এখন স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিনে তৈরি হওয়া এসব সমস্যা ধীরে ধীরে সমাধান করতে হবে।
দেশে কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, “দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের জন্য ৫০ শয্যা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে। এসব কেন্দ্রের কাজ শুরু করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।”
এ সময় নিহত কনিকার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান মন্ত্রী। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারকে তাৎক্ষণিক ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে মাতৃহারা শিশুটির পূর্ণ ভরণপোষণের দায়িত্ব সরকার বহন করবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
গত ২৯ জুন অসুস্থ হয়ে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুনির সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী কনিকা মণ্ডল (৩৫)। সেখানে চিকিৎসক লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি।
অস্ত্রোপচারের পরদিন কনিকার পেট ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলেও অভিযোগ রয়েছে, তা যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি। পরে অবস্থার অবনতি হলে গত ৩ জুলাই তাকে ঢাকার কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখানে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ৭ জুলাই কনিকার পেটে সার্জিক্যাল গজ থাকার বিষয়টি শনাক্ত হয়। একই দিন অস্ত্রোপচার করে গজটি বের করা হয়। দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ঢাকার ওই হাসপাতালে মারা যান কনিকা মণ্ডল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সফরকালে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামসুল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) তারিফ উল হাসান, বালিয়াকান্দি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী মুস্তাফিজুর রহমানসহ স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।