বাংলাদেশি চলচ্চিত্র পরিচালক রায়হান রাফীর নতুন সিনেমা ‘প্রেশার কুকার’ সমকালীন নগরজীবনের নারীদের জীবন, সামাজিক কাঠামো ও মানসিক চাপকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি সমষ্টিগত কাহিনিনির্ভর চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির মূল প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত ‘প্রেশার কুকার’ শব্দটি উচ্চচাপ, সীমাবদ্ধতা ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিস্থিতির মধ্যে মানবজীবনের টানাপোড়েনকে নির্দেশ করে, বিশেষ করে নারীদের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে।
চলচ্চিত্রটির কাহিনিতে শহরের চারটি ভিন্ন সামাজিক স্তরের নারীর জীবন তুলে ধরা হয়েছে—নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি চরিত্রদের মাধ্যমে। প্রধান চরিত্র রেশমাকে কেন্দ্র করে নিম্নবিত্ত নারীর দৈনন্দিন সংগ্রাম, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দায়িত্ব এবং সামাজিক সীমাবদ্ধতার বাস্তবতা ফুটে উঠেছে। অন্যান্য নারী চরিত্রগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যেও বিদ্যমান মানসিক চাপ, সম্পর্কের জটিলতা এবং সামাজিক প্রত্যাশার চিত্রায়ণ করা হয়েছে।
চলচ্চিত্রে নারীদের ব্যক্তিগত পরিচয়, স্বনির্ভরতা এবং সামাজিক অবস্থানের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে দেখানো হয়েছে কীভাবে পারিবারিক কাঠামো, বৈবাহিক সম্পর্ক এবং সামাজিক মূল্যবোধ নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে সন্তানের প্রতি মমতা, সম্পর্ক রক্ষা এবং পারিবারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নারীদের ত্যাগের বিষয়ও কাহিনিতে স্থান পেয়েছে।
রায়হান রাফীর নির্মাণশৈলীতে সংলাপ ও পরিস্থিতি উপস্থাপনায় বাস্তবধর্মী প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। চলচ্চিত্রে নগর জীবনের ভাষা ও আচরণগত বাস্তবতা উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে, যা চরিত্রগুলোর সামাজিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তবে দীর্ঘ সময়ব্যাপী কাহিনি এবং একাধিক চরিত্রের সমান্তরাল বিকাশ চলচ্চিত্রের বর্ণনাকে ঘন ও জটিল করে তুলেছে বলে নির্মাণগত দিক থেকে উল্লেখ করা হয়।
চলচ্চিত্রটি প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদকে উৎসর্গ করা হয়েছে। তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র নির্মাণ দর্শন, বিশেষ করে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক বাস্তবতা তুলে ধরার যে ধারা, তার সঙ্গে ‘প্রেশার কুকার’-এর বিষয়বস্তুর একটি আদর্শিক সংযোগ লক্ষ্য করা যায় বলে চলচ্চিত্র বিশ্লেষণে উঠে আসে। একই সঙ্গে ১৯৯৭ সালে নির্মিত ‘পালাবি কোথায়’ চলচ্চিত্রের সঙ্গে একটি প্রাসঙ্গিক তুলনাও আলোচনায় এসেছে, যেখানে নারীকেন্দ্রিক কাহিনির মাধ্যমে সমাজ বাস্তবতা উপস্থাপিত হয়েছিল। সময়ের ব্যবধান সত্ত্বেও নারীর সামাজিক অবস্থানের মৌলিক পরিবর্তন কতটা হয়েছে, তা নিয়েও চলচ্চিত্রটি আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
চলচ্চিত্রে নায়কবিহীন কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে একাধিক নারী চরিত্রই গল্পের কেন্দ্রীয় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই কাঠামো সমসাময়িক চলচ্চিত্রে প্রচলিত ন্যারেটিভ পদ্ধতির তুলনায় ভিন্নতর দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব এবং মানসিক অবস্থার পরিবর্তন গল্পের অগ্রগতিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে নাজিফা তুষির পারফরম্যান্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তার চরিত্রায়ণে বাস্তবধর্মী অভিব্যক্তি, শারীরিক ভাষা এবং সংলাপ উপস্থাপনা কাহিনির আবেগঘন দিককে শক্তিশালী করেছে। অন্যান্য শিল্পীরাও নিজ নিজ চরিত্রে সামাজিক শ্রেণিভেদ ও মানসিক অবস্থার বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন।
চলচ্চিত্রটি প্রবাসে প্রদর্শনের পর দর্শকদের মধ্যে নারীর সামাজিক অবস্থান, পারিবারিক চাপ এবং নগরজীবনের মানসিক চাপ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। বিশেষ করে আধুনিক নগর সমাজে ব্যক্তিজীবনের গোপন চাপ ও প্রকাশ্য আচরণের পার্থক্য চলচ্চিত্রটির অন্যতম আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।
‘প্রেশার কুকার’ সমকালীন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে নারীকেন্দ্রিক কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে সামাজিক বাস্তবতা, শ্রেণি বিভাজন এবং পারিবারিক কাঠামোর ভেতরে নারীর অবস্থানকে কেন্দ্র করে একটি সমষ্টিগত বর্ণনা উপস্থাপন করা হয়েছে।