ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির তীরে তুরস্কের ঐতিহাসিক শহর আনতালিয়া। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা এই শহরেই আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর বসতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ু আসর জাতিসংঘের ‘৩১তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন’ বা ‘কপ-৩১’। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি কার্যকর হওয়ার এক দশক পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে এবারের সম্মেলনটি নিছক কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক নয়; বরং এটি মানবজাতির টিকে থাকার লড়াইয়ে এক চূড়ান্ত অগ্নিপরীক্ষা।কপের দীর্ঘ ইতিহাসে এবার দেখা যাচ্ছে এক বিরল ও অভিনব কূটনৈতিক সমঝোতা। সম্মেলনটির যৌথ নেতৃত্ব বা ‘কো-প্রেসিডেন্সি’ পালন করছে দুই ভিন্ন গোলার্ধের দুটি দেশ—তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়া। স্বাগতিক দেশ হিসেবে তুরস্ক সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা বা ‘অ্যাকশন এজেন্ডা’ পরিচালনা করছে, আর মূল কূটনৈতিক দর-কষাকষির সভাপতিত্ব করছে অস্ট্রেলিয়া। অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ উদ্যোগে জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে নির্মম শিকার প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে।এবারের সম্মেলনের আরেকটি বড় চমক হলো কাগুজে প্রতিশ্রুতির বদলে সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ। তুরস্কের প্রেসিডেন্সি থেকে প্রথমবারের মতো ২০৩৫ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বিদ্যুতায়নের হার ৩৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং ভবন নির্মাণ খাতে জ্বালানি তীব্রতা অন্তত ২৫ শতাংশ কমানোর মতো বাস্তবমুখী প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে।সম্মেলন শুরুর ঠিক আগ মুহূর্তে জাতিসংঘ ও বিশ্বখ্যাত গবেষণা সংস্থাগুলোর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলো বিশ্ববাসীর কপালে চিন্তার গভীর ভাঁজ ফেলেছে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) সর্বশেষ ‘এমিশনস গ্যাপ রিপোর্ট ২০২৬’ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে প্রাক্-শিল্প যুগের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে ধরে রাখার সুযোগ কার্যত হাতছাড়া হয়ে গেছে। সাময়িকভাবে হলেও পৃথিবী এই বিপৎসীমা অতিক্রম করতে চলেছে।প্রতিবেদনের পূর্বাভাস আরো ভয়াবহ। বর্তমান নীতিমালা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এমনকি দেশগুলো তাদের বর্তমান জলবায়ু প্রতিশ্রুতি শতভাগ বাস্তবায়ন করলেও তাপমাত্রা ২ দশমিক ৬ ডিগ্রিতে পৌঁছাবে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই মহাবিপর্যয় ঠেকাতে হলে ২০২৫ সালের তুলনায় ২০৩০ সালের মধ্যে ১৮ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে অন্তত ৪৫ শতাংশ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমাতেই হবে।প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি ও মানুষের বিপন্নতাবিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) তথ্যমতে, বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের ঘনত্ব এখন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে (৪২৬ দশমিক ৮ পিপিএম) পৌঁছেছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী ‘এল নিনো’র প্রভাব যুক্ত হওয়ায় সামনে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী খরার আশঙ্কা করা হচ্ছে।জলবায়ু পরিবর্তনের এই থাবা এখন সরাসরি মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করেছে, বিশ্বের প্রায় ৩ দশমিক ৩ থেকে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মানুষ বর্তমানে জলবায়ুজনিত উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, প্যারিস চুক্তির পরবর্তী এক দশকে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহজনিত গড় বার্ষিক মৃত্যু প্রায় ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। শুধু প্রাণহানি নয়, অর্থনৈতিক ক্ষতিও সামাল দেওয়ার বাইরে চলে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কেবল বীমাকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণই ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, অথচ উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন খাতে বছরে প্রায় ৩০৫ বিলিয়ন ডলারের বিশাল অর্থায়ন ঘাটতি রয়ে গেছে।হিমালয়ের হিমবাহ ধস ও উজানের ঝুঁকিবৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে, যা হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। ভাটির দেশ হিসেবে এই আকস্মিক বন্যার প্রথম ও সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসে লাগে বাংলাদেশের ওপর। হিমবাহের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে বর্ষায় ভয়াবহ বন্যা ও নদীভাঙন দেখা দিচ্ছে, আবার শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় তীব্র পানিসংকট তৈরি হয়ে কৃষি ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে।হিমালয় অঞ্চলের ঝুঁকি মোকাবিলায় আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ডেটা বিনিময়, যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।বঙ্গোপসাগরের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় সংকটসমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আর মাত্র এক মিটার বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১৭ থেকে ২০ শতাংশ ভূমি স্থায়ীভাবে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা প্রায় তিন কোটি মানুষকে জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত করতে পারে। বঙ্গোপসাগরের লোনাপানি উপকূলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি করছে এবং উর্বর ফসলি জমি নষ্ট করছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, যা প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে বাংলাদেশকে ঘূর্ণিঝড় থেকে রক্ষা করে, সমুদ্রের উচ্চতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশউত্তরে হিমালয়ের বরফ গলা পানি আর দক্ষিণে ফুলে ওঠা বঙ্গোপসাগর—এই দুইয়ের মাঝখানে বাংলাদেশ কীভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছে, সেই আশঙ্কা মূল্যায়ন করে পরিকল্পনা নেওয়া উচিত। এবারের জলবায়ু সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি সম্মেলনে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিকল্পনা ও উদ্বেগের বিষয়টি বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরবেন। বাংলাদেশের জনগণ কোনো অপরাধ না করেও অন্যের নিঃসরণের দায় বহন করছে—এই নৈতিক অবস্থান তুলে ধরে তিনি উন্নত বিশ্বকে নিঃসরণ কমানো এবং লস অ্যান্ড ড্যামেজ তহবিলের অর্থ দ্রুত ছাড় করার জন্য জোর তাগিদ দিতে পারেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ উপকূলে সবুজ বেষ্টনী তৈরি, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এবং ২০ হাজার কিলোমিটার নদী-খাল খননের মতো বাংলাদেশের নিজস্ব অভিযোজন মডেলগুলো বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে।লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক (বর্তমানে সরকারের প্রধান তথ্য অফিসার)