অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে পিবিআইকে ২১ জানুয়ারির মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছে আদালত।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস
অভিনেত্রী তানজিন তিশার বিরুদ্ধে এবার ফেইসবুকে ‘আপত্তিকর ছবি ও ভুল তথ্য’ ছড়ানোর অভিযোগে মানহানির মামলা করেছেন ফ্যাশন ডিজাইনার ও ভেলমেট-ইয়ুথ ম্যাগাজিনের সম্পাদক সানায়া আনাম ওয়াফিকা চৌধুরী।
রোববার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কামাল কামাল উদ্দীনের আদালতে তিনি এ মামলা করেন বলে তার আইনজীবী শুভ্র সিনহা রনি জানান।
তিনি বলেন, আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে অভিযোগ তদন্তের (পিবিআই) নির্দেশ দিয়েছে। আগামী ২১ জানুয়ারির মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ২৮ অক্টোবর সানায়া আনাম ওয়াফিকা চৌধুরীর পক্ষে তানজিন তিশাকে উকিল নোটিস পাঠান আইনজীবী শুভ্র সিনহা রায়।
সানায়া আনাম ঢাকার এর আগে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালত ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করেছেন। মামলা দুটি চলমান রয়েছে।
এবারের মামলার আর্জিতে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার অভিনেত্রীর ‘Tanjin Tisha’ নামের ভেরিফায়েড ফেইসবুক পেইজ থেকে সানায়া আনামের বিরুদ্ধে ‘বিভিন্ন আপত্তিকর ছবি ও ভুল তথ্য’ ছড়ানো হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তানজিন তিশা বাদীর সম্পর্কে ‘ভুল তথ্য’ উপস্থাপন করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে মামলায়।
সেখানে বলা হয়, গত বছরের ৭ নভেম্বর তানজিন তিশা তার ফেইসবুক মেসেঞ্জার থেকে সানায়া আনামকে হুমকি দেন। ওই বার্তায় বলা হয়েছিল, “ফেমাস হইলে বইল, আমি তোমার ছবি আপলোড করে দিবোনে।”
তানজিন তিশার বিরুদ্ধে সানায়া চৌধুরী প্রথম মামলাটি দায়ের করেন ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর। আদালত তখন মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গুলশানের ১২৭ নম্বর সড়কে সানায়া চৌধুরীর একটি ফ্যাশন হাউজ ও স্টুডিও রয়েছে। তানজিন তিশা ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে পরার জন্য তার কাছ থেকে ৭৫ হাজার টাকা দামের একটি শাড়ি নেন।
অনুষ্ঠান শেষে পরদিন শাড়িটি ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও তা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সানায়া।
মামলায় বলা হয়, শাড়িটি ফেরত চেয়ে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তানজিন তিশাকে ফেইসবুক মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠান সানায়া। এরপর শাড়ি ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তানজিন তিশা তাকে ‘গালিগালাজ ও প্রাণনাশের হুমকি’ দেন।
পরে ২০২৫ সালের ১৩ ও ১৮ মার্চ দুটি অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে তানজিন তিশার সঙ্গে দেখা হলে শাড়িটি ফেরত চান সানায়া। তখনও শাড়িটি ফেরত দেওয়া হয়নি বলে মামলায় দাবি করা হয়।
এরপর ১০ নভেম্বর ফেইসবুক মেসেঞ্জারে ফোন করে তানজিন তিশা মামলা করার এবং ‘সামাজিকভাবে হেয় করার’ হুমকি দেন বলে অভিযোগ করেন সানায়া। ওই অভিযোগে ১২ নভেম্বর গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরিও (জিডি) করেন তিনি।
তবে তদন্ত করে তানজিন তিশার বিরুদ্ধে অভিযোগের ‘সত্যতা পাওয়া যায়নি’ জানিয়ে গত ২৫ মে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন পিবিআইয়ের এসআই মো. জাহাঙ্গীর আলম।
ওই প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আদালতে নারাজি আবেদন করেন সানায়া। ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম ২৫ অক্টোবর তা মঞ্জুর করে সিআইডি পুলিশকে নতুন করে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন।
শাড়ির মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে পিবিআই বলে, সানায়া চৌধুরী ফ্যাশন ডিজাইনার এবং তানজিন তিশা মডেল ও অভিনেত্রী। বিভিন্ন ফ্যাশন ও অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠানে একসঙ্গে অংশ নেওয়া এবং ভ্রমণের সূত্রে তাদের মধ্যে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ তৈরি হয়েছিল।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানের জন্য তানজিন তিশা তার সাবেক চালকের মাধ্যমে সানায়ার কাছ থেকে শাড়িটি নেন।
তদন্তে দুই পক্ষের ফেসবুক মেসেঞ্জারের কথোপকথনের স্ক্রিনশটও পর্যালোচনা করা হয়। পিবিআই বলেছে, ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর শাড়ি ফেরত চেয়ে সানায়া বার্তা পাঠালেও তানজিন তিশা তা দেখেননি। পরবর্তী সময়ের কথোপকথনেও শাড়িটি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি উঠে আসে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর সানায়া মেসেঞ্জারে শাড়িটি ফেরত দিতে বলেন। জবাবে তানজিন তিশা প্রথমে কোন শাড়ির কথা বলা হচ্ছে জানতে চান। পরে শাড়িটির ছবি পাঠানো হলে তিশা জানান, বিষয়টি তার মনে নেই এবং খুঁজে দেখে জানাবেন।
এ ছাড়া, বাদী বিবাদীকে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখের শুভেচ্ছাও পাঠান। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৮ মে তার সাথে একটি অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রামে দেখা হলে সেখানে তাদের কুশল বিনিময় হয়। এর কিছুদিন পরে বাদীর ফ্যাশন হাউজের শোরুমের ট্রায়াল রুম নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য শোনা যায় এবং উভয়ের ব্যক্তিগত ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়।
এরপর দুই পক্ষের মধ্যে এ নিয়ে কথাবার্তা ও মনোমালিন্য হয় বলে তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য।
তানজিন তিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাতে তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে লেখেন, সানায়ার সঙ্গে তার আগে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। ওই শাড়ির আগেও তিনি সানায়ার কাছ থেকে আরও কয়েকটি শাড়ি নিয়েছেন এবং পরে সেগুলো ফেরত দিয়েছেন। এর জন্য সানায়া কোনো টাকা নেননি বলেও তিশা তদন্ত কর্মকর্তাকে জানিয়েছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে তানজিন তিশার বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, শাড়িটি নেওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলেন। তার সাবেক চালক শাড়িটি ফেরত না দিয়ে চাকরি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে সানায়ার ঠিকানা জানার চেষ্টা করেন শাড়িটি ফেরত দেওয়ার জন্য।
পরে মামলার বিষয়টি জানার পর ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠান বলে তদন্ত কর্মকর্তাকে জানান তিশা।
পিবিআই বলেছে, গত ৩১ মার্চ তানজিন তিশা ডাকযোগে শাড়িটি ফেরত পাঠানোয় প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হুমকির অভিযোগের ক্ষেত্রে পিবিআই বলে, ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর তানজিন তিশার পাঠানো মেসেজের শেষ অংশে শাড়িটি ফেরত পাঠানোর ঠিকানা জানতে চাওয়া হয়েছিল এবং সানায়ার সুন্দর জীবন কামনা করা হয়েছিল। এসব বিবেচনায় হুমকির অভিযোগেরও প্রমাণ তারা পায়নি।
তানজিন তিশার বিরুদ্ধে এরপর ‘হত্যার হুমকি’ দেওয়ার অভিযোগে দ্বিতীয় মামলাটি করেন সানায়া চৌধুরী।