1. editor@priyodesh.com : editor : Mohammad Moniruzzaman Khan
  2. monirktc@yahoo.com : স্টাফ রিপোর্টার :
  3. priyodesh@priyodesh.com : priyodesh :
রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:০৪ অপরাহ্ন
শিরোনামঃ
আওয়ামী লীগ আমলে ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছেন: প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তিতুমীর জয়পুরহাটের ডিসিকে অপসারণে ছাত্রদলের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম বিবিএসকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছি: অর্থমন্ত্রী মিস ইউনিভার্সের ৭৫তম আসরে বাংলাদেশের হয়ে লড়বেন মাহি রোহিঙ্গা সংকট মিয়ানমারের, তাদেরই সমাধান করতে হবে: আইনমন্ত্রী দেশের তিন জেলায় বিজিবি মোতায়েন গ্রাহকসেবা বাড়াতে খুলনায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের বৈঠক দক্ষিণ আফ্রিকা সফর থেকেও ছিটকে যাওয়ার শঙ্কায় সাদমান স্টেম দিবস: চাকরির বাজার বদলে যাচ্ছে, বাংলাদেশ কি প্রস্তুত? সাভার-আশুলিয়া, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে কাজে ফিরেছেন পোশাক শ্রমিকরা

৭ নভেম্বর: যে বিপ্লব বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের ইতিহাস

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬
  • ৩০ Time View

৭ নভেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে রচিত হয় এক নতুন অধ্যায়। জন্ম হয় এক নতুন বাংলাদেশের। অনেকে এটাকে ইতিহাসের বাঁক হিসেবেও মনে করেন। আবার অনেকে একে রাষ্ট্রের স্বাধীন অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সংহতির প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করেন। তবে ৫১ বছর আগে এই দিনটিতে বাংলাদেশের মধ্যমণিতে পরিণত হন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর যোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার, জেড ফোর্সের প্রধান ও স্বাধীনতার মহান ঘোষক।

৭ই নভেম্বর আমাদের জাতীয় জীবনে উজ্জ্বলতম দিন। চেতনায় ভাস্বর অনন্য এ দিনটি বাংলাদেশে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’- হিসেবে পালিত হয়। মূলত ৭ই নভেম্বরে দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির গতিপথ নির্ধারিত হয়। সামরিক বাহিনীর মধ্যে চলা অস্থিরতার অবসান ঘটে। প্রতিষ্ঠিত হয় চেইন অব কমান্ড। তবে স্থিতিশীলতার এই পর্যায়ে উপনীত হতে বাংলাদেশকে একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সামরিক বাহিনীর মধ্যে ঘটে অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান। এ সুযোগে গজিয়ে ওঠা দেশি-বিদেশি চক্রান্তও মোকাবিলা করতে হয় বাংলাদেশকে।

ইতিহাসবিদদের মতে, ৭৫ সালের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও হৃদয়বিদারক ধারাবাহিক ঘটনার চূড়ান্ত পর্যায় হলো ৭ই নভেম্বর। এর আগে ওই বছরের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন সে সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান। নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা গুম, খুন, আওয়ামী লীগ দলীয় নেতা-কর্মীদের সর্বগ্রাসী দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, অনাচার, লুটপাট রোধে ব্যর্থতা এবং গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় দুঃশাসন কায়েমের অভিযোগে এ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেন সামরিক বাহিনীর কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মেজর।

আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো- সামরিক বাহিনীর একটি অংশের অভ্যুত্থানে শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর তারই বাকশাল সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমেদ নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। তার সঙ্গে যোগ দেন সদ্য বিগত সরকারের ২৩ জন মন্ত্রীর মধ্যে ২১ জন। এছাড়া তার সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করেন তৎকালীন সেনাবাহিনী প্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ, নৌবাহিনী প্রধান রিয়াল এডমিরাল এমএইচ খান, বিমানবাহিনী প্রধান একে খোন্দকার, বিডিআর প্রধান খলিলুর রহমান। রক্ষীবাহিনী ও পুলিশ বাহিনীর প্রধানরাও নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখান।

এদিকে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের সার্বক্ষণিক সহোচর হন অভ্যুত্থানকারী সামরিক কর্মকর্তারা। তারা রাষ্ট্রপতিকে বিভিন্ন দিক নির্দেশনা দিতে থাকেন। এ নিয়ে সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসারদের মধ্যে সুপ্ত ক্ষোভ ছিল। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ২৪শে আগস্ট মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নতুন সেনাপ্রধান হন। জেনারেল (অব.) ওসমানীকে রাষ্ট্রপতির প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা বানানো হয়। এছাড়া তিন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের জন্য বাহিনী প্রধানদের ওপর ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ’- নামে একটি পদ তৈরি করা হয়। এ পদে নিয়োগ পান বিডিআর’র মহাপরিচালক খলিলুর রহমান। বাহিনী প্রধানদের চাপে রাখতেই রাষ্ট্রপতি মোশ্তাক সুচতুরভাবে এ কাজটি করেছিলেন। এর পাশাপাশি বঙ্গভবনে থাকা ১৫ই আগস্টে অভ্যুত্থানকারী মেজর ফারুক, রশীদের ক্ষমতা প্রদর্শনতো ছিলই।

সবকিছু মিলিয়ে দেশে একটা অস্থিতিকর পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সবখানেই একটা গুমোট পরিস্থিতি। এ প্রেক্ষাপটেই এলো নভেম্বর মাস। এ মাসের অনুঘটক ছিলেন তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ এবং সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল তাহের। এর মধ্যে দেশের মানুষ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের কাছে জিয়াউর রহমান ছিলেন অধিক জনপ্রিয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্বর হামলার প্রেক্ষাপটে দেশবাসীকে প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা দিতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। সেই বিভীষিকাময় মুহূর্তে চট্টগ্রামে নিজ সামরিক ইউনিট নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন জিয়াউর রহমান। এছাড়া চট্টগ্রামে অস্থায়ী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে তিনি দেশবাসীর প্রাণভোমরায় পরিণত হন।

জেনারেল জিয়া সেনাপ্রধান হওয়ার পর খালেদ মোশাররফ সেনাবাহিনীতে নিজের অবস্থান নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন বলে আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরী তার ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য’- গ্রন্থে উল্লেখ করেন। এ সময় প্রতিনিয়ত নানা গুজবের ডালপালা ছড়াতে থাকে। দেশের মানুষ এক ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। সেনানিবাসেও অস্থিরতা বিরাজ করছিল। দেশ প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

এ প্রেক্ষাপটে ২ নভেম্বর রাতে ঢাকার ৪৬ ব্রিগেডের কমান্ডার কর্নেল শাফায়েত জামিলকে সঙ্গে নিয়ে সেনানিবাসে অভ্যুত্থান ঘটান সিজিএস খালেদ মোশাররফ। প্রথমে ২৮শে অক্টোবর অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করা হয়। পরে তারিখ বদলানো হয়। ভবিষ্যৎ অন্ধকার মনে করে খালেদ মোশাররফ জিয়াউর রহমানকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। ২ নভেম্বর রাতেই সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে সস্ত্রীক গৃহবন্দি করা হয় এবং জোরপূর্বক সেনাবাহিনীর পদ থেকে তার ইস্তফা আদায় করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছুই চলছিল। ৩ নভেম্বর ভোরে খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানের সমর্থনে ঢাকার আকাশে যুদ্ধবিমান মহড়া দেয়।

জেনারেল ওসমানীর মধ্যস্থতায় খালেদ মোশাররফের সঙ্গে আপসরফার ভিত্তিতে ১৫ই আগস্ট অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত রশিদ, ফারুক, ডালিমসহ ১৫ জনকে বিমানে ব্যাংকক যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় তারা ঢাকা থেকে বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে ব্যাংকক চলে যান বলে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ ‘জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি’- গ্রন্থে উল্লেখ করেন।

৩ নভেম্বর আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। ইতিহাসে যা জেলহত্যা নামে পরিচিত। খন্দকার মোশতাক আহমেদ রাষ্ট্রপতি পওয়ার পর আওয়ামী লীগের চার নেতা তাজউদ্দিন আহমেদ, নজরুল ইসলাম, মনসুর আলী ও কামরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর থেকে তারা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন। খালেদ মোশাররফের গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে নভেম্বরের ৩ তারিখ রাতেই ওই চার নেতাকে রাষ্ট্রপতি মোশতাক আহমেদ , মেজর রশিদ-ফারুকের নির্দেশে জেলের ভেতরেই নৃশংসভাবে ১ম বেঙ্গল ল্যান্সারের ট্যাংক রেজিমেন্টের কয়েকজন সৈনিক হত্যা করেন বলেন মইনুল হোসেন বীরবিক্রম তার গ্রন্থে উল্লেখ করেন।

৪ নভেম্বর নতুন সেনাপ্রধান হন খালেদ মোশাররফ। তিনি ভারতপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এদিন ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি মিছিল হয়। এতে খালেদ মোশাররফের ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ ও তার মা অংশ নেন। এতে সেনাবহিনীর একটি বড় অংশ ও দেশের মানুষ অনেকে মনে করেন আওয়ামী লীগ ও ভারতপন্থিদের পক্ষে অভ্যুত্থান হয়েছে। ৪ নভেম্বর রাতেই খন্দকার মোশতাক পদত্যাগ করেন এবং তাকে ওইদিনই গৃহবন্দি করা হয়। ৬ নভেম্বর প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন।

আগেই বলেছি- সেনাবাহিনীতে জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তা ছিল অসীম। তাই তাকে গৃহ অন্তরীণ করে খালেদ মোশাররফের সেনাপ্রধান হওয়া অনেককেই ক্ষুব্ধ করেছিল। তাদেরই একটি অংশ ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে পাল্টা অভ্যুত্থান করলো। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল তাহেরের অনুগত ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার’ সদস্যরা। বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা ছিল সৈনিকদের একটি গুপ্ত সংগঠন। এর সদস্যরা মূলত মুক্তিযুদ্ধের সময় নবম সেক্টরের অধিনায়ক মেজর জলিলের অনুগত। রাজনৈতিক দল জাসদে যোগ দেয়ার পর জলিল মূলত কর্নেল তাহেরকে সেনাসদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার দায়িত্ব দেন। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল। তাহের এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রচলিত সেনাবাহিনীর পরিবর্তে গণচীনের আদলে একটি বিপ্লবী গণবাহিনী গড়ে তোলার প্রয়াস চালান।

জিয়াউর রহমানের জনপ্রিয়তায় ভর করে তাহের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্নে মূলত ৭ নভেম্বরে আবির্ভূত হন। তিনি জিয়াউর রহমানকে তুরুপের তাস হিসেবে খেলতে চেয়েছিলেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা সামরিক বাহিনীর মধ্যে লিফলেট ছড়িয়ে সাধারণ সিপাহিদের উত্তেজিত করে তোলে। এমনকি সামরিক বাহিনীকে কর্মকর্তাশূন্য করার মত ভ্রান্ত প্রচারণাও তারা চালাতে থাকে। তাদের কয়েকটি শ্লোগান ছিল এ রকম, “সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই”, “সিপাহী সিপাহী ভাই ভাই, সুবেদারের ওপরে অফিসার নাই”।

তাহের সম্ভবত জিয়ার জনপ্রিয়তা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। জেনারেল জিয়ার প্রতি অনুগত সৈন্যদল ও ২য় ফিল্ড আর্টিলারির সেনা-কর্মকর্তা ও জওয়ানরা লে. কর্নেল (অব.) তাহেরের রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা আগে থেকে আঁচ করতে পেরে পৃথকভাবে একটি আগাম পরিকল্পনা প্রণয়ন করে ফেলেন অতি গোপনে। সেই অনুযায়ী ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত অর্থাৎ ৭ নভেম্বর রাত ১২টা ১ মিনিটে অর্থাৎ জাসদের অভ্যুত্থান শুরু হবার ১ ঘণ্টা আগেই ২য় ফিল্ড আর্টিলারীর জওয়ানরা মেজর মহিউদ্দিন এবং সুবেদার মেজর আনিসুল হকের নেতৃত্বে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের বাসায় গিয়ে তাকে মুক্ত করেন এবং কাঁধে করে তাকে ২য় ফিল্ড আর্টিলারীর হেড কোয়াটারে নিয়ে আসেন। এর কিছুক্ষণই পরই তাহের সেখানে হাজির হন। তিনি জিয়াকে সেনানিবাসের বাইরে বের করে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন। তবে তিনি ব্যর্থ হন। তাহেরের কথামতো জিয়াউর রহমান সেদিন আর রেডিও সেন্টারে যাননি। তাহেরের উদ্দেশ্য ছিল জিয়াউর রহমানকে দিয়ে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচে রাষ্ট্র কাঠামোর ঘোষণা দেয়া। এরই অংশ হিসেবে তাহেরের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে নির্বিচারে হত্যাও করে। তবে জিয়াউর রহমান তাহেরের সঙ্গে সেনানিবাসের বাইরে না গিয়ে বরং সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফেরাতে উদ্যোগী হন।

৭ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না। এমনকি অভ্যুত্থানের পূর্ব-নির্ধারিত কোনো নেতাও ছিল না। মূলত জনপ্রিয় সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে ক্ষমতা দখলে খালেদ মোশাররফের অভিপ্রায়ই তাৎক্ষণিক সিপাহী বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটায়। সেনাবাহিনীর মধ্যকার অস্থিরতাও এ বিপ্লবের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এরই মধ্যে তাহের জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দিত্ব থেকে উদ্ধারের নামে তার দল জাসদের রাজনৈতিক দর্শন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের অলীক স্বপ্ন বাস্তবায়নে বিভোর ছিলেন। কিন্তু খালেদ মোশাররফ ও তাহের কেউ সফল হননি। মেধা, বিচক্ষণতা ও জনপ্রিয়তায় জিয়াউর রহমান তাদের দুইজনকেই টপকে যান। ঘটনার শেষান্তে তাই জিয়াউর রহমান নায়কের ভূমিকায় আবির্ভূত হন এবং সবকিছুই তার নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রয়োজনের মুহূর্তে জীবন বাজি রেখে হলেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। যেটা তিনি একবার ৭১ সালের ২৬ মার্চ করে দেখিয়েছিলেন। তার স্বাধীনতার ঘোষণায় সেদিন হতবিহবল জাতি সম্বিত ফিরে পেয়েছিল। তিনি ছিলেন অমিত সাহসী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম। আবার তিনি সুশৃঙ্খল আইন অনুগত সৈনিকও বটে। এসব গুণ জিয়াউর রহমানকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। তিনি সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতীকে পরিণত হন। জিয়াউর রহমানের সমর্থনে তাই ৭ নভেম্বর সামরিক বাহিনীর জওয়ান ও আপামর জনসাধারণ রাজপথে নেমে এসেছিলেন। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সিপাহী-জনতার বিপ্লবের অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু।

৭ নভেম্বর তাই কেবল অতীতের কোনো অভ্যুত্থান কিংবা ক্ষমতার পালাবদলের দিন নয়; এটি ছিল এক চরম অনিশ্চয়তা, বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলার মধ্যে বিপর্যস্ত রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনার এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ধারাবাহিক অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড এবং সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিভাজনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সামরিক শৃঙ্খলা যখন গভীর সংকটের মুখে, তখন ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ সেই অচলাবস্থা কাটিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে। জিয়াউর রহমানের মুক্তি, তাঁর নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও সংহতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা পরবর্তী বাংলাদেশের গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। শুধু সামরিক বাহিনী নয়, প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক সমাজজীবনেও স্বাভাবিকতা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দিনটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য গভীর। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জিয়াউর রহমানের পরিচিতি, সেনাবাহিনীতে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং সংকটকালে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা তাঁকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, সামরিক শৃঙ্খলা, জাতীয় সংহতি ও রাজনৈতিক বিকাশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ, সেদিনের ঘটনাপ্রবাহ কেবল ক্ষমতার কেন্দ্র বদলায়নি; সংকটাপন্ন একটি রাষ্ট্রকে নতুন করে দাঁড়ানোর পথও তৈরি করেছিল। তাই ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে শুধু একটি স্মরণীয় তারিখ নয়, রাষ্ট্র ও সমাজের স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এক তাৎপর্যপূর্ণ ঐতিহাসিক অধ্যায়। আর এ অধ্যায়ের মূল নায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category
© ২০২৬ প্রিয়দেশ