আলোকস্বল্পতায় প্রথম দফায় যখন খেলায় ছেদ পড়ল, তখন সাদমান ইসলাম অপরাজিত ছিলেন ৯৬ রানে। এরপর আঁধার কেটে সূর্যের হাসির দেখা পাওয়ায় তার মনেও হয়তো আশা জেগেছিল— সেঞ্চুরিটা এদিনই পেয়ে যাওয়ার।
কিন্তু বিধি বাম! তিন ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের এই বাঁহাতি ওপেনারের অপেক্ষা যখন আর মাত্র একটি রানের, সেসময় আবার পর্যাপ্ত আলোর অভাবে খেলা বন্ধ হয়ে গেল। একইসঙ্গে দিনের খেলারও ইতি টেনে দিলেন আম্পায়াররা। ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরির সুবাস পাওয়া সাদমান উৎকণ্ঠা আর রোমাঞ্চ নিয়ে অপরাজিত থেকে গেলেন ৯৯ রানে।
বুধবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্ট। টস জিতে ব্যাটিং বেছে নেওয়া টাইগাররা সাদমানের কল্যাণে প্রথম দিনে ৭৪ ওভারে তুলেছে ৩ উইকেটে ২১৩ রান।
শুরু থেকেই পিচে অসমান বাউন্স ও টার্নের দেখা মিললেও সাদমান ছিলেন নিজের সামর্থ্যে অবিচল। ধৈর্য ও শৃঙ্খলার ছাপ রেখে সেঞ্চুরি থেকে মাত্র একটি রান দূরে আছেন তিনি। দলকে ভরসা দিয়ে তার ২১৯ বলের দায়িত্বশীল ইনিংসটি সাজানো ১০টি চারে।
সেঞ্চুরির দুয়ারে দাঁড়িয়ে সাদমানকে এখন কাটাতে হবে দীর্ঘ একটি রাত। দিনশেষে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হয়ে আসা ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন জানান, গোটা বাংলাদেশ দলই শঙ্কা নিয়ে থাকবে অপেক্ষায়, ‘নার্ভাস… আমরা পুরো দলই আসলে নার্ভাস। দিনশেষে সবাই চাচ্ছিলাম যেন ওর জন্য একশটা হয়ে যায়। কারণ সে প্রায় ৩০টার মতো টেস্ট খেলেছে, মাত্র দুইটা সেঞ্চুরি। আমার মনে হয়, এই সংখ্যাটা আরও বেশি হওয়া উচিত ছিল। আশা করব, এটা হলে সে যেন বুঝতে পারল যে একশ করতে হলে কী করতে হবে। আমার মনে হয়, এই ইনিংসটা তার পরবর্তী জীবনে অনেক সাহায্য করতে পারে।’
উইকেট থেকে ক্যারিবিয়ান বোলাররা সারাদিনই সাহায্য পেয়েছেন। এর মাঝে বাজে শটে বিদায় নেন আরেক ওপেনার তানজিদ হাসান তামিম ও মুমিনুল হক। আর পায়ে টান লাগায় স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়তে হয় মুশফিকুর রহিমের চোটে সুযোগ পাওয়া তাওহিদ হৃদয়কে।
সব পরিস্থিতিই সামাল দিয়ে সাদমান ক্রিজে আছেন আস্থার পরিচয় দিয়ে। সালাউদ্দিনের মতে, তিনি প্রথম থেকেই উইকেটের ভাষা বুঝতে সক্ষম হয়েছেন, ‘আমি বলব, সে এই উইকেটটা খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। পুরো ইনিংসটা যদি দেখেন, সে খুব বেশি ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলেনি। মাঝে মাঝে হয়তো আমরা বলি, সে অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ শট খেলে ফেলে। তাছাড়া, ম্যাচের যেকোনো পর্যায়ে হয়তো আপনার কঠিন সময় আসে। ওই সময়টায় আমরা হয়তো মাঝে মাঝে আলগা শট খেলে ফেলি। তবে আমার কাছে মনে হয়, সে উইকেটটা পর্যবেক্ষণ করে, কঠিন সময়টা অতিক্রম করে তারপর সে তার নিজের নিয়ন্ত্রণে ইনিংসটা খেলছে।’
শিষ্যের প্রশংসা করার পাশাপাশি বাংলাদেশের ব্যাটিং কোচের চাওয়া, ইনিংসটা যেন আরও অনেক বড় হয়, ‘আমি অনেক দিন পরে তার এমন ইনিংস দেখছি। কারণ সে কিন্তু শেষ অনেকগুলো ইনিংসে ৫০-৬০ রান করেছে, কিন্তু সেগুলো লম্বা হচ্ছিল না। আমার মনে হয়, সে এটা নিয়েও হয়তো কাজ করেছে। এটার কারণেই হয়তো ইনিংসটা লম্বা হচ্ছে। আমি আশা করব, সে যেন এটা আরও লম্বা করতে পারে।’
আগের ৩১ টেস্টে নয়টি ফিফটির পাশে সাদমানের সেঞ্চুরি মাত্র দুটি— অর্থাৎ ইনিংস লম্বা করার ঘাটতি স্পষ্ট। গত বছরের এপ্রিলে চট্টগ্রামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিতীয় সেঞ্চুরিটির দেখা পেয়েছিলেন। সেই থেকে এদিনের আগে খেলা ১৭ ইনিংসে আরও চারটি ফিফটি করলেও কোনোটিকেই তিন অঙ্কে রূপ দিতে পারেননি তিনি।
সেসব আক্ষেপ থাকলেও সালাউদ্দিনের আশা, এই ইনিংসটি সাদমানকে আগামীতে প্রেরণা জোগাবে, ‘আমার মনে হয়, ও নিজেও হয়তো অনুধাবন করছে বা এটা নিয়ে হয়তো অন্যদের সাথে কথা বলেছে। সে অনেকগুলো ইনিংসে খুব ভালো খেলে দাপুটে পঞ্চাশ করছে, কিন্তু সেগুলো আসলে লম্বা করতে পারেনি। হয়তো কোনো প্রসেসে তার সমস্যা ছিল। আমার মনে হয়, এই ইনিংসটা তাকে সাহায্য করবে এবং সে নিজেই খুঁজে বের করছে যে আসলে ওই সময়টায় কী করা উচিত। আমি আশা করব, যেটা বললাম একটু আগে— এই ইনিংসটা তাকে অনেক কিছু শেখাবে, পরবর্তী জীবনে একশ করার জন্য অনেক সহায়তা করবে।’