আজকের দিনে বৈভব সূর্যবংশীকে ঘিরে ভারতীয় ক্রিকেটে যে উন্মাদনা, প্রায় একই রকম আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন ধ্রুব মহেন্দ্র পান্ডোভ। শচিন টেন্ডুলকারের সমসাময়িক এই ক্রিকেট প্রতিভাকে তখন ভারতের ভবিষ্যৎ তারকা হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু মাত্র ১৮ বছর বয়সে এক সড়ক দুর্ঘটনা থামিয়ে দেয় তার সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার।
১৯৯২ সালের ৩১ জানুয়ারি। উড়িষ্যায় দেওধর ট্রফির ম্যাচ খেলে ধ্রুব পৌঁছেছিলেন আম্বালায়। সেখান থেকে তার যাওয়ার কথা ছিল পাটিয়ালায় বাবা-মায়ের কাছে। জানুয়ারির উত্তর ভারত তখন ঘন কুয়াশায় ঢাকা। দৃশ্যমানতা ছিল অত্যন্ত কম।
তৎকালীন ক্রিকেটার চেতন শর্মা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত আম্বালায় অপেক্ষা করতে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই ধ্রুবর একটি সফরকারী দলের বিপক্ষে ম্যাচ খেলার কথা ছিল। তাই বাবা-মায়ের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানোর তাগিদে তিনি দ্রুত পাটিয়ালার উদ্দেশে রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ট্যাক্সিতে করে যাত্রা শুরু করলেও আর গন্তব্যে পৌঁছানো হয়নি। ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন ধ্রুব। হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কাছে হার মানেন তিনি। বয়স তখন মাত্র ১৮। অথচ ভারতীয় টেস্ট দলে জায়গা পাওয়ার দরজায় কড়া নাড়ছিলেন এই তরুণ।
১৩ বছরেই প্রথম শ্রেণির অভিষেকধ্রুবর প্রতিভার ব্যাপ্তি বোঝা যায় তার পরিসংখ্যানেই। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পাঞ্জাবের হয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন তিনি। তুলনায় শচিন টেন্ডুলকার প্রথম শ্রেণিতে অভিষেক করেছিলেন ১৫ বছর বয়সে।
এর পরের বছরই, মাত্র ১৪ বছর বয়সে, প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করেন ধ্রুব। শচিন তার প্রথম শ্রেণির শতরান করেছিলেন ১৫ বছর বয়সে।
১৭ বছর বয়সে রঞ্জি ট্রফিতে ১ হাজার রান পূর্ণ করে সবচেয়ে কম বয়সে এই মাইলফলক স্পর্শ করার রেকর্ডও গড়েছিলেন ধ্রুব। ফলে শচিনের সঙ্গে তার তুলনা তখন নিয়মিতই উঠে আসত।
পাঞ্জাবের হয়ে খেলার পাশাপাশি ছয়টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচও খেলেছিলেন এই ব্যাটার। ভারতের হয়ে খেলার স্বপ্ন ছিল তার চোখে। সফরকারী দলের বিপক্ষে বড় রান করে নির্বাচকদের নজরে পড়ার ব্যাপারে তিনি ছিলেন আত্মবিশ্বাসী।
সতীর্থদের চোখে ভবিষ্যৎ তারকাধ্রুবর সঙ্গে খেলেছেন এমন ক্রিকেটাররা তার প্রতিভা ও মানসিক দৃঢ়তার কথা বহু বছর পরও মনে রেখেছেন। সেই দেওধর ট্রফির ম্যাচে সাউথ জোনের হয়ে খেলা অনিল কুম্বলে এক সাক্ষাৎকারে ধ্রুবকে স্মরণ করে বলেছিলেন, তিনি ছিলেন একজন প্রতিভাবান ও সম্ভাবনাময় ব্যাটার। এমন একজন ক্রিকেটার, যার মধ্যে ভবিষ্যতের বড় তারকা হওয়ার সব উপাদান ছিল-তাকে হঠাৎ হারানো ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক।
ধ্রুবর সতীর্থ ও পরবর্তী সময়ে ভারতের ওপেনার হওয়া বিক্রম রাঠোরও তার ক্রিকেটীয় বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করেছিলেন। তার মতে, ধ্রুবর মস্তিষ্ক ছিল অত্যন্ত পরিণত এবং ক্রিকেট সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল অসাধারণ। তার সামনে ছিল উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
আর অজয় জাদেজার স্মৃতিতে ধ্রুব ছিলেন আরও প্রাণবন্ত এক চরিত্র। জাদেজার ভাষায়, এত অল্প বয়সে এতটা নির্ভীক ক্রিকেটার তিনি খুব কমই দেখেছেন। যেকোনো প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করার সাহস ছিল ধ্রুবর, আর তার লড়াকু মানসিকতা অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করত।
এক দুর্ঘটনায় বদলে যায় একটি পরিবারধ্রুবর অকালমৃত্যু শুধু ভারতীয় ক্রিকেটকেই একজন সম্ভাবনাময় তারকা থেকে বঞ্চিত করেনি, গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল পান্ডোভ পরিবারেও।
ধ্রুবর ছোট ভাই কুনাল ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাইলেও পরিবার থেকে তাকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এমনকি তার মা ক্রিকেটের কিট পুড়িয়ে দিয়েছিলেন, যাতে কুনাল আর ক্রিকেট খেলতে না পারেন।
প্রায় ৩৪ বছর পেরিয়ে গেছে সেই দুর্ঘটনার। সময়ের সঙ্গে ভারতীয় ক্রিকেট বদলে গেছে, বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের অবস্থানও হয়েছে আরও শক্তিশালী। কিন্তু ধ্রুব মহেন্দ্র পান্ডোভের গল্প আজও একটি প্রশ্ন রেখে যায়-সেদিন যদি সেই দুর্ঘটনাটি না ঘটত, তাহলে ভারতীয় ক্রিকেটে আরও একজন বড় তারকার জন্ম হতো কি?
সম্ভবত সেই প্রশ্নের উত্তর আর কখনো জানা যাবে না। তবে ১৩ বছর বয়সে প্রথম শ্রেণিতে অভিষেক, ১৪-তে সেঞ্চুরি এবং ১৭-তে রঞ্জি ট্রফিতে ১ হাজার রান; ধ্রুবর পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ভারত কী অসাধারণ এক ক্রিকেট প্রতিভাকে খুব অল্প বয়সেই হারিয়েছিল!