রণাঙ্গনে রুশ বাহিনী প্রতিনিয়ত জয় ছিনিয়ে আনছে এবং ইউক্রেনীয় সেনাদের একের পর এক অঞ্চল থেকে পিছু হটতে বাধ্য করছে বলে জোর দাবি করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে কিয়েভের বর্তমান নেতৃত্বকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সমঝোতা বা আলোচনায় বসার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে দেওয়া সবচেয়ে বিস্তৃত ও বিস্তারিত বক্তব্যে পুতিন স্বীকার করেন যে, রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ ভূখণ্ডে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলা বাস্তবসম্মত ক্ষতি সাধন করেছে এবং এই ড্রোন ব্যবস্থা তাদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার আধিপত্য অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি সাংবাদিকদের অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, শত্রুবাহিনী ভেঙে গুঁড়িয়ে যাবে এতে তার কোনো সন্দেহ নেই। তবে এই সাফল্য ঠিক কত দিনের মধ্যে আসবে সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাননি তিনি। এ ছাড়া রাশিয়ায় নতুন করে সামরিক মোবিলাইজেশন বা সৈন্য সমাবেশের যে গুঞ্জন উঠেছে, তাকে সম্পূর্ণ ‘বানোয়াট ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
সাড়ে চার বছরের দীর্ঘ এই যুদ্ধে রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। ওয়াশিংটন ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলা শান্তি আলোচনা ভেস্তে যায়। বিভিন্ন জনমত জরিপ বলছে যে রাশিয়ার জনগণের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি এই যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্তি বাড়ছে এবং দেশটির অর্থনীতিতে তৈরি হওয়া চাপ নিয়ে বিভিন্ন প্রভাবশালী মহল থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসবের তোয়াক্কা না করে পুতিন চরম আত্মবিশ্বাসী ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রদর্শন করেন। যুদ্ধক্ষেত্রের বিস্তারিত পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি দাবি করেন, রণাঙ্গনে রুশ বাহিনীর এগিয়ে যাওয়ার গতি আরও দৃশ্যমান ও ত্বরান্বিত হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট জানান, আগস্ট মাসেই ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় দোনেৎস্ক এলাকার প্রায় ২৭০ বর্গকিলোমিটার বা ১০৪ বর্গমাইল এলাকা দখল করেছে তাদের সেনারা। এ ছাড়া ইউক্রেনীয় বাহিনীর দুটি বড় দলকে রুশ সেনারা ঘিরে ফেলেছে বলে দাবি করেন তিনি, যার একটি দলে চার হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার ৮০০ জন এবং অন্যটিতে প্রায় দুই হাজার সৈন্য রয়েছে। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এসব দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। পুতিন আরও যোগ করেন, রুশ বাহিনী স্লোভিয়ানস্ক এবং ক্রামাতোর্স্ক শহরের দিকে অগ্রসর হওয়া অব্যাহত রেখেছে এবং ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে একটি ব্যাপক ও শক্তিশালী হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি বিমান সংস্থাগুলোকে সতর্ক করে বলেছিলেন যে ইউক্রেনীয় ড্রোনের কারণে রাশিয়ার আকাশসীমা কার্যত অচল হয়ে পড়বে। জেলেনস্কির এই বক্তব্যকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করে পুতিন হুঁশিয়ার করেন যে, এমন কিছু ঘটলে রাশিয়াও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পথ খুঁজে নেবে।
কিরগিজস্তানে আয়োজিত সম্মেলনের পর এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পুতিন সাফ জানান, সন্ত্রাসীদের সঙ্গে কোনো প্রকার দর-কষাকষি করা সম্ভব নয়। তবে যুদ্ধকে সাময়িকভাবে ‘স্থগিত’ করার পরিবর্তে পুরোপুরি ‘বিদায়’ জানানোর লক্ষ্যে আলোচনায় বসতে মস্কো এখনো প্রস্তুত রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আবারও সংলাপে বসতে তার আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করে পুতিন বলেন, যদি কেউ এই প্রক্রিয়ায় ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে তবে তাতে তাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। রাশিয়া কেবল অনর্থক সময়ক্ষেপণ এড়াতে চায় উল্লেখ করে তিনি জানান, বর্তমানে কিছুটা স্থবির হয়ে থাকা এই প্রক্রিয়ায় কেউ সুনির্দিষ্ট কোনো ফলাফল আনতে পারলে তাতে মস্কোর কোনো আপত্তি নেই।
ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে পুতিন সরাসরি স্বীকার করেছেন, যদিও এই হামলার ফলে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া জ্বালানিসংকটের কথা তিনি উল্লেখ করেননি। তিনি দাবি করেন যে তাদের সুরক্ষাব্যবস্থার মান আগের চেয়ে অনেক উন্নত করা হয়েছে এবং বর্তমানে শোধনাগারগুলোর মাত্র ১০ শতাংশ মেরামত করা বাকি রয়েছে।
এদিকে, গত মাসে জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার চেষ্টার পেছনে রাশিয়াকে দায়ী করে বার্লিনের দেওয়া অভিযোগের তীব্র ও কঠোর সমালোচনা করেছেন পুতিন। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের সরকার নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা এবং হ্রাস পাওয়া রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা থেকে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরাতে মস্কোর ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জার্মানি ইচ্ছে করে সাজানো তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করে রাশিয়াকে ফাঁসানোর চেষ্টা করছে বলে পুতিন দাবি করলেও, ঠিক কিসের ওপর ভিত্তি করে তিনি এই পাল্টা অভিযোগ করছেন সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ দেননি।
সূত্র: রয়টার্স