লেবাননে পরিবেশগত বিপর্যয়ের জন্য ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ইকোসাইড’ বা পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ তুলেছেন দেশটির পরিবেশমন্ত্রী তামারা এল জেইন।
২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে দক্ষিণ লেবাননের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও সম্পদের বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই প্রতিবেদনের ভূমিকায় তিনি এই অভিযোগ করেন।
লেবাননের বৈজ্ঞানিক গবেষণাবিষয়ক জাতীয় কাউন্সিল (সিএনআরএস-এল) প্রণীত ১০৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় লেবাননে চওড়া পাতার গাছ, পাইন, স্টোন পাইনসহ ৫ হাজার হেক্টর (প্রায় ১২ হাজার ৩৫০ একর) বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়েছে, স্থানীয় জলবায়ুর ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে ও ভূমিক্ষয় ঘটেছে।
ফসল, গবাদিপশুর খামার, বনজ সম্পদ, মৎস্য ও জলজ চাষের অবকাঠামোসহ ১১৮ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮৭ মিলিয়ন পাউন্ড) মূল্যের ভৌত কৃষিসম্পদ ধ্বংস হয়েছে।
ফসল কাটা ব্যাহত হওয়া ও ফলন কমে যাওয়ার ফলে কৃষি উৎপাদনে ৫৮৬ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৪৩৩ মিলিয়ন পাউন্ড) ক্ষতি হয়েছে।
৮১৪ হেক্টর জলপাইবাগান, ৬৩৭ হেক্টর লেবুজাতীয় ফলের বাগানসহ মোট ২ হাজার ১৫৪ হেক্টর (প্রায় ৫ হাজার ৩২০ একর) ফলের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। কলাবাগানেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
মাটিতে ফসফরাসের ঘনত্ব ১ হাজার ৮৫৮ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিশেষত, দক্ষিণ লেবানন ও পূর্বের বেকা উপত্যকায় দূষণ সবচেয়ে বেশি।
হামলার এলাকার বাইরেও ব্যাপক বায়ুদূষণ ঘটানো হয়েছে। এতে ভাসমান কণা, সালফার অক্সাইড ও নাইট্রোজেন অক্সাইড এবং ডাই–অক্সিন ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের মতো বিষাক্ত যৌগ নির্গত হয়েছে।
ইসরায়েলের সমালোচকদের কথায়, দেশটি বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে ‘গাজা কৌশলের’ পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে বেসামরিক জনগণকে বাস্তুচ্যুত করা, হাসপাতাল ও চিকিৎসাকর্মীদের লক্ষ্য বানানো, গ্রামের পর গ্রাম গুঁড়িয়ে দেওয়া, পানি সরবরাহের অবকাঠামো ধ্বংস করা ও সংবাদকর্মীদের হত্যা করা।
২০২৩ সালে ফিলিস্তিনের গাজায় সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর কয়েক মাসের মধ্যে ইসরায়েলি বাহিনী সেখানকার ৩৮ থেকে ৪৮ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদিত ভূমি ও কৃষিজমি ধ্বংস করে। জলপাইবাগান ও খামারগুলো ধ্বংস করা হয়। হামলার ফলে ভূগর্ভের পানি গোলাবারুদ ও বিষাক্ত পদার্থে দূষিত হয়। বাতাস ধোঁয়া ও ভাসমান কণায় দূষিত হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সব মিলিয়ে লেবাননের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ২৫ বিলিয়ন ডলার (তিন লক্ষ কোটি টাকা)। এর মধ্যে ৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ভৌত ক্ষতি, ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া পুনরুদ্ধার কার্যক্রম ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন ১১ বিলিয়ন ডলার।
লেবাননের পরিবেশমন্ত্রী তামারা এল জেইন বলেন, এসব ক্ষতি শুধু পরিবেশ নয়, বরং জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে।
তিনি আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে বলেন,‘লেবানন একা এই পরিবেশগত ক্ষতি সামাল দিতে পারবে না। পরিবেশ পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। এই ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব দরকার।’
অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, ‘আইডিএফ তাদের সামরিক কার্যক্রমের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে সচেতন। ইসরায়েলের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা কাজ করে এবং বেসামরিক মানুষ ও পরিবেশের ক্ষতি কমাতে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করা হয়।’
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান