ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রার প্রভাব থেকে পোশাকশ্রমিকদের সুরক্ষা দিতে এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় পৃথক মানদণ্ড প্রণয়ন, আইনি স্বীকৃতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ, শিল্প খাতের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর প্রতিনিধিরা।
পাশাপাশি শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধন, ছোট কারখানাগুলোর জন্য সহজ শর্তে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনে বিনিয়োগের জন্য সরবরাহকারীদের সহায়তা দিতে সরকার, কারখানার মালিক ও আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
গতকাল রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে 'সিক্স সিজনস, ফোর সামারস' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে লায়লা গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক মো. শামীম ফেরদৌস বলেন, "কারখানার উৎপাদনকক্ষে সর্বোচ্চ কত তাপমাত্রা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ধারণ করে সরকার একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে।"
কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এ ব্যয়ের দায়িত্ব কে নেবে, সেই প্রশ্নও তোলেন শামীম ফেরদৌস।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জেসন জুড বলেন, ভিয়েতনামের মতো দেশে শিল্পকারখানায় তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় নির্দিষ্ট মানদণ্ড রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইএলআর গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর এন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ ডেভেলপমেন্ট (সিইডি), বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটি (বিসিডব্লিউএস) এবং ওয়াইজেন ইঞ্জিনিয়ারিং যৌথভাবে গবেষণাটি পরিচালনা করেছে।
কর্মক্ষেত্রে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার মানদণ্ড বা নীতিমালা হলো অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা থেকে শ্রমিকদের সুরক্ষায় নির্ধারিত কিছু নিয়ম ও নির্দেশনা। এতে তাপমাত্রা কীভাবে পরিমাপ করা হবে, কখন শ্রমিকদের অতিরিক্ত বিরতি দিতে হবে এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে কারখানার মালিকদের কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে, তা নির্ধারণ করা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের এখন বছরে প্রায় সাত মাস, অর্থাৎ এপ্রিলের শুরু থেকে অক্টোবরের শেষ পর্যন্ত তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হয়। গবেষকেরা ঢাকা অঞ্চলের আটটি পোশাক কারখানার বিভিন্ন উৎপাদন বিভাগে ২৮টি তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা পরিমাপক সেন্সর স্থাপন করে প্রতি ঘণ্টায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছেন। পাশাপাশি প্রায় ৩৬ জন শ্রমিকের বাসার পরিবেশও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, সারা বছরই কারখানার ভেতরে তাপজনিত চাপ বাইরের পরিবেশের তুলনায় বেশি থাকে। বিশেষ করে পোশাক ইস্ত্রি ও ফিনিশিং বিভাগে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এসব বিভাগের শ্রমিকেরা তাদের কর্মদিবসের ৫৮ শতাংশ সময় উচ্চ তাপজনিত ঝুঁকির মধ্যে এবং প্রায় ১৮ শতাংশ সময় মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে কাটিয়েছেন।
তাপমাত্রার এই প্রভাব শুধু কারখানাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। জুন মাসের একটি সপ্তাহে দেখা গেছে, রাতেও শ্রমিকদের বাসার তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে ছিল। এমনকি কিছু বাসায় সন্ধ্যার পর কারখানার উৎপাদনকক্ষের চেয়েও বেশি গরম ছিল এবং সারা রাতেও তাপমাত্রা খুব একটা কমেনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গবেষণায় অংশ নেওয়া কারখানাগুলোতে অতিরিক্ত গরমের কারণে কর্মঘণ্টায় গড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ উৎপাদনশীলতা কমেছে। গবেষণার আওতাধীন একটি কাপড় উৎপাদন কারখানায় এ হার ছিল ৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় কারখানার অবস্থান, উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও ভবনের নকশা বিবেচনায় তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি পরিমাপের সুপারিশ করা হয়েছে গবেষণায়। পাশাপাশি যোগ্য প্রকৌশলীদের সহায়তায় কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনের ব্যয় ও সম্ভাব্য আর্থিক সুফল মূল্যায়ন এবং এ বিনিয়োগের খরচ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও ক্রেতারা কীভাবে ভাগ করে নেবে, সে বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, কাজ ও বিশ্রামের ভারসাম্য, উৎপাদনের পরিমাণভিত্তিক মজুরি, উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এবং চিকিৎসাজনিত ছুটির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করে শ্রমিকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নীতিমালা সংশোধনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রকৌশলগত মূল্যায়নে দেখা গেছে, কারখানায় শীতলীকরণব্যবস্থা স্থাপনে বিনিয়োগ করা অর্থ তুলনামূলক দ্রুত উঠে আসতে পারে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এ বিনিয়োগের অর্থ ফেরত আসতে গড়ে এক বছরেরও কম সময় লাগবে। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতি বিবেচনায় এ সময় বেড়ে ২ দশমিক ৯ বছর এবং সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে ৪ দশমিক ৪ বছর হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের রপ্তানিমুখী পোশাক খাতে অতিরিক্ত তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে শীতলীকরণব্যবস্থাসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগে আনুমানিক ২৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। তিন বছরে এ অর্থ ব্যয় করা হলে তা বাংলাদেশের ২০২৫ সালের পোশাক রপ্তানি আয়ের প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশের সমান হবে।
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার সলিডারিটির (বিসিডব্লিউএস) নির্বাহী পরিচালক ও শ্রমিকনেত্রী কল্পনা আক্তার বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো শ্রমিকদের কথা প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
তিনি বলেন, কারখানা ও বাসা—উভয় জায়গাতেই অতিরিক্ত গরমের কারণে শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। কখনো কখনো অসুস্থতার কারণে তাদের ছুটিও নিতে হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ইউনিক্লো বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সৌরভ কুমার মৈত্র, ওয়াইজেন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেক রবিন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ আরিফুল ইসলাম।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.