দেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ কমেছে। এ নিয়ে টানা দুই প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমলো।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এর আগে জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছিল ৭০ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এদিকে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বাড়লেও এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে আগের প্রান্তিকের তুলনায় মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশ।
অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলো বাংলাদেশের ঋণমান কয়েক দফা কমিয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগ কমার পেছনে এটিও একটি কারণ। কেননা, কোনো দেশে বিনিয়োগ কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা যাচাই করতে দেশটির ঋণমানকে গুরুত্ব দেন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা।
অর্থনীতিবিদেরা আরও বলছেন, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণও সম্ভাব্য বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। এসব কারণে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ কমছে, যার প্রভাব পড়ছে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহে।
নতুন বিদেশি বিনিয়োগ বলতে দেশে আসা নতুন বিদেশি মূলধনকে বোঝায়। এই বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকায় বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশে নতুন প্রকল্পে অর্থ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই বেশি সতর্ক হয়ে উঠছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ডলার। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৮ কোটি ১৩ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ।
তবে নতুন বিনিয়োগ কমলেও আলোচ্য প্রান্তিকে মোট নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। নতুন বিনিয়োগ, পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ মিলিয়ে এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে নিট বিদেশি বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৩৪ কোটি ৬৯ লাখ ৪০ হাজার ডলারে।
গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩০ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার। সেই হিসাবে এক বছরে নিট বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ১২ শতাংশ। মূলত দেশে আগে থেকেই ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বাড়ায় মোট বিনিয়োগ বেড়েছে। তবে আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকের তুলনায় নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে ২২ শতাংশ।
পুনর্বিনিয়োগ করা মুনাফা বলতে বাংলাদেশে আগে থেকেই ব্যবসা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর অর্জিত মুনাফার যে অংশ দেশে রেখে আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়, তা বোঝায়। তবে এতে মোট বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লেও নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশে আসছেন, এমনটি বোঝায় না।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফার পুনর্বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯১ লাখ ডলারে। গত বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৬ কোটি ৮২ লাখ ডলার। অর্থাৎ, আলোচ্য সময়ে মোট বিদেশি বিনিয়োগের বড় অংশই এসেছে দেশে আগে থেকে কার্যক্রম চালানো বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে, নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে নয়।
এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে বিদেশি কোম্পানিগুলোর মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ বাবদ মোট ৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেশে এসেছে। একই সময়ে এ খাতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৪০ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার। ফলে নিট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ২৬ কোটি ৯ লাখ ১০ হাজার ডলারে।
এদিকে, সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের তিনটি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ। এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে এ খাতে নিট ঋণ এসেছে ৮৬ লাখ ১০ হাজার ডলার, যা আগের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ছিল ২ কোটি ৬১ লাখ ৩০ হাজার ডলার। অর্থাৎ, এক প্রান্তিকের ব্যবধানে এ খাতে নিট ঋণ কমেছে ৬৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর গত বছরের একই প্রান্তিকের ৫ কোটি ৮০ লাখ ৮০ হাজার ডলারের তুলনায় কমেছে ৮৫ দশমিক ১৭ শতাংশ।
আলোচ্য প্রান্তিকে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ বাবদ মোট ৩৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার দেশে এসেছে। বিপরীতে দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে ৩২ কোটি ৫১ লাখ ৯০ হাজার ডলার। ফলে এ খাত থেকে নিট বিদেশি বিনিয়োগে খুব সামান্য অর্থ যোগ হয়েছে।
এদিকে, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে ব্যাংক খাতের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করেছে। চলতি বছরের জুনে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ২ শতাংশে।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংক খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার নেমে আসে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬ শতাংশে। অথচ নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মূলধন পর্যাপ্ততার হার ১০ শতাংশ।
রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ, ব্যাংক খাতের ক্রমবর্ধমান সংকট এবং অর্থনীতির নানা দুর্বলতার কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ঋণমানও চাপের মুখে পড়েছে।
তবে ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক ঋণমান নির্ধারণকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে কিছুটা ভিন্নতা দেখা যাচ্ছে। গত সেপ্টেম্বরে মুডিস বাংলাদেশের ঋণমান 'বি২' অপরিবর্তিত রেখে ঋণমানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে পূর্বাভাস স্থিতিশীল করেছে। অন্যদিকে, এসঅ্যান্ডপি ও ফিচ বাংলাদেশের ঋণমান 'বি+' অপরিবর্তিত রাখলেও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির পূর্বাভাস নেতিবাচক করেছে।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.