সব ধরনের প্রস্তুতি শেষ। ভিসার অপেক্ষা। এর মধ্যেই হঠাৎ সংশোধিত তালিকা। আর তাতেই বাদ পড়লেন ২০ জন চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী।
তাদের জায়গায় যুক্ত করা হলো নতুন ২৫ জনকে। পবিত্র হজে দায়িত্ব পালনের স্বপ্নভঙ্গ হওয়া এসব স্বাস্থ্যকর্মীর অভিযোগ—দলীয় প্রভাব, তদবির ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শেষ মুহূর্তে তালিকায় বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি ব্যবস্থাপনায় গঠিত ‘হজ মেডিক্যাল টিম-২০২৬’-এ চিকিৎসক, নার্স, ফার্মাসিস্ট ও মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টদের নিয়ে মোট ১৭৭ জনের একটি তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে চিকিৎসক ৮০ জন, নার্স ৪৭ জন, ফার্মাসিস্ট ৩০ জন এবং মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট/টেকনিশিয়ান ২০ জন ছিলেন।
তারা সবাই প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করে হজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
কিন্তু গত ১৫ মার্চ হঠাৎ ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারি করে। এতে আগের তালিকা থেকে চিকিৎসক ১০ জন কমিয়ে ৭০ জন, নার্স ৪৬, ফার্মাসিস্ট ২৩ এবং ল্যাব/ওটি অ্যাসিসট্যান্ট ১৮ জন করা হয়। ফলে আগের তালিকায় থাকা ২০ জন বাদ পড়েন।
একই সঙ্গে নতুন করে অন্তত ২৫ জনের নাম প্রস্তাব করা হয়।
অভিযোগ উঠেছে, নতুন যুক্ত হওয়া অনেকেই বিএনপিপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাব, মেডিকেল টেকনোলজিস্টদের সংগঠন এম-ট্যাব এবং বিএনপিপন্থী নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রভাব খাটানো ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তারা তালিকায় স্থান পেয়েছেন বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাদ পড়া একাধিক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, তারা সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন, পাসপোর্ট জমা, একাডেমিক সনদ অনুবাদ, বায়োমেট্রিক সম্পন্ন এবং সৌদি আরবের নুসুক কার্ডের জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করেছিলেন। সবশেষে ভিসার অপেক্ষায় থাকতেই হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক চিকিৎসক বলেন, “সব প্রক্রিয়া শেষ করে আমরা প্রায় নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটি নির্দেশনায় আমাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু অন্যায় নয়, অপমানজনকও।”
বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক ফার্মাসিস্ট বলেন, “আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নই। নিয়ম মেনেই আবেদন করেছিলাম। ভিসার অপেক্ষায় রেখে বাদ দেওয়ায় হতাশ হয়েছি।”
সূত্র জানায়, হজ মেডিক্যাল টিমের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় খরচে সৌদি আরবে যাওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট পরিমাণ আর্থিক সুবিধা পেয়ে থাকেন। একজন চিকিৎসক প্রায় ১২ লাখ টাকা এবং নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রায় ৮ লাখ টাকা করে পান। এর একটি অংশ সৌদি আরব যাওয়ার আগেই প্রদান করা হয়। এ কারণে এই টিমে অন্তর্ভুক্তিকে ঘিরে প্রতিবছরই তদবির ও প্রতিযোগিতা থাকে।
তালিকা পরিবর্তনের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অধিশাখার যুগ্ম সচিব ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, “আগের প্রক্রিয়ায় আমি জড়িত ছিলাম না। কিছু বিষয় সামনে আসায় ওপর থেকে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আমার বিস্তারিত জানা নেই।”
ড্যাব বা অন্য কোনো সংগঠনের প্রভাব ছিল কি না—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “কে কোন সংগঠনের, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কার নাম পরিবর্তন বা সংযোজন হয়েছে, সেটিও আমার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নেবে।”
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেষ মুহূর্তে এ ধরনের তালিকা পরিবর্তন শুধু ভুক্তভোগীদের জন্য অন্যায় নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। হজের মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ সেবায় নিয়োজিত টিম গঠনে এমন অনিয়ম ভবিষ্যতে আরো বড় জটিলতা তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা তাদের।