অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং বিদ্যুতের উচ্চমূল্য নিয়ে বিতর্ক চলার মধ্যেই বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি বাড়িয়েছে ভারতীয় ধনকুবের গৌতম আদানির মালিকানাধীন আদানি পাওয়ার। দুই দেশের সরকারি উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে গ্যাসের তীব্র সংকট ও ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আদানির সরবরাহ আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
উভয় দেশের তথ্যের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত বছরের শেষ তিন মাসে (অক্টোবর–ডিসেম্বর) গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সময় আদানি প্রায় ২২৫ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে।
সারা ২০২৫ সালে আদানি গ্রুপ বাংলাদেশে রেকর্ড ৮৬৩ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করেছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ভারতের অংশ ছিল ১২ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে রেকর্ড ১৫ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশেষ করে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ২৭ দিনেই বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ একাই সরবরাহ করেছে আদানি গ্রুপ।
এই বাড়তি নির্ভরতার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়া এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। অথচ গত এক দশকে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল মোট উৎপাদনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালে দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ৬ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এই বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে চলতি বছর কয়লা আমদানির পরিমাণ আরও বাড়ানো হবে।
উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৫ সালেই বাংলাদেশের কয়লা আমদানি আগের বছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। আদানি গ্রুপ ২০২৩ সালের শুরুতে গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে।
তবে বিদ্যুৎ বাণিজ্য বাড়লেও আদানির সঙ্গে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত একটি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি চুক্তিতে ‘অস্বাভাবিক অসংগতি’ খুঁজে পাওয়ার কথা জানিয়েছে এবং বিদ্যুতের দাম বাজারমূল্যের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি বলে উল্লেখ করেছে।
এদিকে দুই দেশের মধ্যে ভিসা কার্যক্রম স্থগিত, নিরাপত্তা উদ্বেগে কূটনীতিক তলবসহ নানা ইস্যুতে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও বিদ্যুৎ বাণিজ্য সম্প্রসারিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রিডের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই বিদ্যুৎ বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য কার্যত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, গ্যাসের অভাবে বাংলাদেশকে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হচ্ছে। তাঁর মতে, সেই তুলনায় আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ এখনো তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।